রাজা রামমোহন রায় ও ব্রাহ্ম সমাজ (সম্পূর্ণ নোটস)
ভূমিকা: ভারতের নবজাগরণের জনক
উনিশ শতকের বাংলার ইতিহাসে মধ্যযুগীয় স্থবিরতা থেকে আধুনিকতার পথে উত্তরণের প্রধান রূপকার ছিলেন রাজা রামমোহন রায়। তাঁকে ভারতের আধুনিক চিন্তাধারার পথিকৃৎ বলা হয়। আঠারো শতকের শেষভাগে এবং উনিশ শতকের শুরুতে বাংলার সমাজ যখন চরম কুসংস্কার, গোঁড়ামি এবং অন্ধবিশ্বাসে আচ্ছন্ন ছিল, তখন তিনি তাঁর যুক্তিবাদী ও বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তাধারার মাধ্যমে সমাজকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসেন। আধুনিক ভারতের ভিত্তি স্থাপন এবং শিক্ষা, সমাজ ও ধর্মে যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করার জন্য ঐতিহাসিকরা তাঁকে ‘বাংলার নবজাগরণের জনক’, ‘প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব’ বা ‘ভোরের পাখি’ বলে অভিহিত করেছেন।
সমাজ সংস্কার: কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম
তৎকালীন সমাজে হিন্দু নারীদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। সমাজ সংস্কারক হিসেবে রামমোহনের সবচেয়ে বড় কীর্তি হলো সতীদাহ প্রথা রদ।
১. সতীদাহ প্রথা বিলোপ (১৮২৯)
স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর বিধবা স্ত্রীকে বলপূর্বক জ্বলন্ত চিতায় পুড়িয়ে মারার মতো নিষ্ঠুর প্রথার বিরুদ্ধে তিনি আমৃত্যু সংগ্রাম করেন। তিনি হিন্দু শাস্ত্র মন্থন করে প্রমাণ করেন যে, হিন্দু ধর্মে সতীদাহের কোনো সমর্থন নেই, বরং এটি একটি জঘন্য সামাজিক নিষ্ঠুরতা। তাঁর অকাট্য যুক্তি এবং নিরলস আন্দোলনের ফলেই ১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ‘১৭ নম্বর রেগুলেশন‘ (Regulation XVII) জারি করে সতীদাহ প্রথাকে আইনত নিষিদ্ধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করেন।
২. বর্ণপ্রথা ও বাল্যবিবাহের বিরোধিতা
রামমোহন রায় তৎকালীন সমাজের গভীরে শিকড় গেড়ে থাকা কৌলিন্য প্রথা, বহুবিবাহ ও বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করেন। তিনি নারীর আত্মমর্যাদা, পৈতৃক সম্পত্তিতে অধিকার এবং নারীশিক্ষার জোরালো সমর্থন করেছিলেন।
শিক্ষা সংস্কার: পাশ্চাত্য শিক্ষার আলোকবর্তিকা
রামমোহন রায় গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন যে, আধুনিক বিজ্ঞান ও পাশ্চাত্য শিক্ষাই ভারতীয়দের কুসংস্কার থেকে মুক্তি দিতে পারে।
-
পাশ্চাত্য শিক্ষার সওয়াল: তিনি সনাতন সংস্কৃত শিক্ষার পরিবর্তে ইংরেজি ভাষা, গণিত, প্রাকৃতিক দর্শন, রসায়ন এবং বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসারের ওপর জোর দেন। ১৮২৩ সালে তিনি বড়লাট লর্ড আমহার্স্টকে একটি ঐতিহাসিক চিঠি লিখে ভারতে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের আবেদন জানান।
-
হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা: ১৮১৭ সালে ডেভিড হেয়ার এবং স্যার হাইড ইস্টের উদ্যোগে কলকাতায় আধুনিক শিক্ষার বিস্তারের জন্য যে হিন্দু কলেজ (বর্তমান প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠিত হয়, তাতে রাজা রামমোহন রায়ের সক্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। যদিও রক্ষণশীল হিন্দুদের চাপের কারণে তিনি পরে কমিটির সদস্যপদ থেকে স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়িয়েছিলেন।
ধর্মীয় সংস্কার: একেশ্বরবাদ ও ব্রাহ্ম সমাজ
রামমোহন রায় ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং মূর্তিপূজার তীব্র বিরোধী ছিলেন।
-
একেশ্বরবাদ (Monotheism): বেদান্ত, ইসলাম এবং পাশ্চাত্যের যুক্তিবাদী দর্শনের প্রভাবে তিনি ‘একেশ্বরবাদ’ বা নিরাকার পরমব্রহ্মের উপাসনায় বিশ্বাসী হয়ে ওঠেন।
-
আত্মীয় সভা ও ব্রাহ্ম সমাজ: হিন্দু ধর্মের কুসংস্কার দূর করতে তিনি প্রথমে ‘আত্মীয় সভা’ স্থাপন করেন। পরবর্তীতে ১৮২৮ সালে তিনি ‘ব্রাহ্মসভা’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীকালে ‘ব্রাহ্ম সমাজ’ নামে পরিচিত হয়। ব্রাহ্ম সমাজের মূল উদ্দেশ্য ছিল সকল প্রকার পৌত্তলিকতার অবসান ঘটিয়ে এক ও অদ্বিতীয় ঈশ্বরের উপাসনা করা।
সাংবাদিকতা: জনমত গঠন ও সংবাদপত্রের ভূমিকা
সমাজ সংস্কারের বার্তাকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তিনি ১৮২১ সালে বাংলায় ‘সম্বাদ কৌমুদী’ এবং ১৮২২ সালে ফারসি ভাষায় ‘মীরাৎ-উল-আখবার’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। এই পত্রিকাগুলির মাধ্যমে তিনি সতীদাহের মতো কুপ্রথার সমালোচনা করতেন এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকারের বিষয়ে জনমত গঠন করতেন।
তাৎপর্য ও উত্তরাধিকার: আধুনিক বাংলার ভিত্তি
উনিশ শতকের বাংলার সমাজ ও চিন্তাধারার বিবর্তনে রামমোহন রায়ের অবদান ছিল এক গভীর দলিলায়ন। তাঁর এই বহুমুখী আন্দোলন বাঙালি সমাজকে মধ্যযুগীয় অন্ধত্ব থেকে আধুনিক যুক্তিবাদ, মানবতাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার পথে পরিচালিত করেছিল।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব: রামমোহনের প্রতিষ্ঠিত যুক্তিবাদী ভিত্তিভূমির ওপর দাঁড়িয়েই পরবর্তীকালে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং স্বামী বিবেকানন্দের মতো সংস্কারকরা বাংলার নবজাগরণকে আরও ত্বরান্বিত করেছিলেন। তাঁর প্রগতিশীল ও উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিই আধুনিক ভারতের সংবিধান ও সমাজব্যবস্থার বীজ বপন করেছিল।