ডিরোজিও ও নব্যবঙ্গ আন্দোলন (Young Bengal Movement)
ভূমিকা: হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিওর পরিচিতি
উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল ও ব্যতিক্রমী নাম হলেন হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও। তিনি ১৮০৯ সালের ১০ এপ্রিল কলকাতার এন্টালি-পদ্মপুকুর অঞ্চলে এক ইন্দো-পর্তুগিজ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ডেভিড ড্রামন্ডের ধর্মতলা একাডেমিতে শিক্ষালাভের সময় তিনি যুক্তিবাদী ও স্বাধীন চিন্তাধারায় অনুপ্রাণিত হন।
মাত্র ১৭ বছর বয়সে, ১৮২৬ সালে তিনি কলকাতার নবপ্রতিষ্ঠিত হিন্দু কলেজে (বর্তমান প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) ইংরেজি সাহিত্য ও ইতিহাসের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। হিন্দু কলেজে তাঁর শিক্ষাদান পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও বৈপ্লবিক। তিনি ছাত্রদের সমস্ত রকম প্রথাগত কর্তৃপক্ষকে প্রশ্ন করতে এবং টমাস পেইনের মতো দার্শনিকদের মুক্তচিন্তার বই পড়তে উৎসাহিত করতেন। তাঁর অসামান্য ব্যক্তিত্ব এবং বাগ্মিতা ছাত্রদের গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
আদর্শ এবং ‘অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন’ (১৮২৮)
ডিরোজিও এবং তাঁর অনুগামীদের মূল আদর্শ ছিল ফরাসি বিপ্লবের সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার চেতনা এবং যুক্তিবাদ (Rationalism)। অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের পরিবর্তে তাঁরা মুক্তচিন্তা এবং বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসাকেই সর্বোচ্চ মূল্য দিতেন।
-
অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন: ছাত্রদের মধ্যে এই স্বাধীন চিন্তার বিকাশ ঘটানোর লক্ষ্যে ডিরোজিও ১৮২৮ সালে ‘অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন’ (Academic Association) নামে একটি বিতর্ক সভা বা সাহিত্য পর্ষদ প্রতিষ্ঠা করেন।
-
তাৎপর্য: এই সভার মূল তাৎপর্য ছিল, এখানে হিন্দু কলেজের তরুণ ছাত্ররা ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান এবং সমাজব্যবস্থা নিয়ে স্বাধীনভাবে তর্ক-বিতর্ক করার সুযোগ পেতেন, যা তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে সম্পূর্ণ অভাবনীয় ছিল।
নব্যবঙ্গ আন্দোলন বা র্যাডিক্যাল মুভমেন্ট
ডিরোজিওর আদর্শে অনুপ্রাণিত এই তরুণ ও প্রগতিশীল ছাত্রদের গোষ্ঠীকেই ইতিহাসে ‘নব্যবঙ্গ’ বা ‘ইয়ং বেঙ্গল’ (Young Bengal) বলা হয়। এই র্যাডিক্যাল গোষ্ঠীর প্রধান লক্ষ্য ছিল সনাতন হিন্দু সমাজের গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের মূলোৎপাটন করা। তাঁরা মূর্তিপূজা, বর্ণপ্রথা বা জাতিভেদ এবং অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানান। জাতপাতের ভেদাভেদ ভাঙতে তাঁরা প্রকাশ্যে অসবর্ণ ভোজন করতেন এবং প্রচলিত সামাজিক বিধিনিষেধকে তুচ্ছ করে প্রগতিশীল মতবাদ প্রচার করতেন।
নব্যবঙ্গ দলের বিশিষ্ট সদস্যবৃন্দ
নব্যবঙ্গ দলের প্রথম সারির সদস্যদের মধ্যে ছিলেন হিন্দু কলেজের একঝাঁক মেধাবী ছাত্র। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন:
-
কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়: ডিরোজিওর অন্যতম প্রিয় ছাত্র, যিনি হিন্দু ধর্মের গোঁড়ামির তীব্র সমালোচনা করতেন এবং পরবর্তীকালে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন।
-
রসিককৃষ্ণ মল্লিক: অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশনের অন্যতম বাগ্মী সদস্য, যিনি ব্রিটিশ শাসন ও ভারতীয় বিচার ব্যবস্থার সমালোচনায় সোচ্চার ছিলেন।
-
প্যারীচাঁদ মিত্র: সমাজ সংস্কার ও নারীশিক্ষার প্রসারে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।
-
রাধানাথ শিকদার: একজন অসামান্য গণিতজ্ঞ ও বিজ্ঞানী, যিনি ইয়ং বেঙ্গল গোষ্ঠীর বিজ্ঞানমনস্কতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতীক ছিলেন।
সামাজিক ও বৌদ্ধিক অবদান
নব্যবঙ্গ গোষ্ঠীর সদস্যরা কেবল তাত্ত্বিক তর্কেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, সমাজ সংস্কারেও তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
-
সমাজ সংস্কার: তাঁরা সতীদাহ প্রথা এবং বাল্যবিবাহের মতো সামাজিক ব্যাধির তীব্র বিরোধিতা করেন এবং নারীশিক্ষা ও নারী অধিকারের স্বপক্ষে জোরালো আন্দোলন গড়ে তোলেন।
-
প্রশাসনিক সংস্কার: তাঁরা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, বিচার ব্যবস্থায় জুরি প্রথার প্রবর্তন, এবং শোষিত কৃষকদের অবস্থার উন্নতির মতো বিভিন্ন প্রশাসনিক সংস্কারের দাবিও তুলেছিলেন। দেশে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারে তাঁদের অবদান ছিল অপরিসীম।
পত্রপত্রিকা ও প্রকাশনা
ডিরোজিয়ানরা তাঁদের প্রগতিশীল ও যুক্তিবাদী চিন্তাধারা জনসমক্ষে প্রচার করার জন্য সাহিত্য ও সাংবাদিকতাকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের সম্পাদিত বিভিন্ন সাময়িকপত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল:
-
‘এনকোয়ারার’ (Enquirer)
-
‘হেসপেরাস’ (Hesperus) * ‘জ্ঞানান্বেষণ’ (Gyananneshun)
এই পত্রিকাগুলির মাধ্যমে তাঁরা হিন্দু সমাজের অন্ধবিশ্বাসকে তীব্র আক্রমণ করতেন এবং মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির চেষ্টা করতেন।
বিরোধিতা এবং বহিষ্কার
ডিরোজিওর এই বৈপ্লবিক চিন্তাধারা তৎকালীন রক্ষণশীল গোঁড়া হিন্দু সমাজে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্কের সৃষ্টি করে। রক্ষণশীল সমাজের মাথারা মনে করতে শুরু করেন যে, ডিরোজিওর শিক্ষায় যুবসমাজ ধর্মভ্রষ্ট হচ্ছে।
প্রবল সামাজিক চাপের মুখে পড়ে হিন্দু কলেজের পরিচালন সমিতি ডিরোজিওর বিরুদ্ধে ছাত্রদের বিপথগামী করার অভিযোগ আনে। অবশেষে, ১৮৩১ সালের ২৫ এপ্রিল কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁকে হিন্দু কলেজ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করে। মাত্র ২২ বছর বয়সে ১৮৩১ সালের ২৬ ডিসেম্বর কলেরায় আক্রান্ত হয়ে এই মহান চিন্তানায়কের অকালমৃত্যু ঘটে।
ঐতিহাসিক ও সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ
উনিশ শতকের বাংলার ইতিহাসে নব্যবঙ্গ আন্দোলন একটি যুগান্তকারী ঘটনা হলেও, দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক আন্দোলন হিসেবে এর বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল।
১. সীমাবদ্ধতা:
-
এই আন্দোলন মূলত কলকাতা-কেন্দ্রিক শিক্ষিত ও শহরের অভিজাত যুবকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল; গ্রামের সাধারণ মানুষ বা কৃষকদের সাথে এর কোনো যোগাযোগ ছিল না।
-
পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রতি তাঁদের অন্ধ আবেগ এবং ভারতীয় ঐতিহ্যের প্রতি চরম অবজ্ঞা তাঁদেরকে সমাজের বৃহত্তর অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল।
২. সুদূরপ্রসারী প্রভাব:
একটি সফল গণআন্দোলন হিসেবে ব্যর্থ হলেও, বাংলার নবজাগরণে ইয়ং বেঙ্গল মুভমেন্টের প্রভাব অনস্বীকার্য। তাঁরাই প্রথম বাঙালির চিন্তাজগতে যুক্তিবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং মুক্তচিন্তার বীজ বপন করেছিলেন। ডিরোজিওর ছাত্রদের তৈরি করা এই যুক্তিবাদী ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই পরবর্তীকালে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো সমাজ সংস্কারকরা বাংলার সমাজ ও রাজনীতিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছিলেন।