Course Content
প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব, সমাজ ও শিক্ষা সংস্কার (Great Reformers: Society & Education)
এই অংশে আমরা আলোচনা করব সেইসব মহান ব্যক্তিত্বদের নিয়ে, যাঁদের সংস্কার আন্দোলন মধ্যযুগীয় কুসংস্কার থেকে বাংলাকে আধুনিক যুগে উত্তরণের পথ দেখিয়েছিল। রাজা রামমোহন রায় থেকে স্বামী বিবেকানন্দ—প্রতিটি অধ্যায় আপনাকে ইতিহাসের গভীরে নিয়ে যাবে।
0/7
সাময়িকপত্র ও সংবাদপত্রের ভূমিকা (Role of Journals & Newspapers)
উনিশ শতকের বাংলার সমাজ সংস্কার আন্দোলনে সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্রগুলো ছিল প্রতিবাদের প্রধান হাতিয়ার। এই টপিকে আমরা জানব কীভাবে 'বামাবোধিনী' নারীর অধিকার নিয়ে সরব হয়েছিল, 'হিন্দু প্যাট্রিয়ট' কীভাবে নীলকর সাহেবদের অত্যাচারের মুখোশ খুলে দিয়েছিল এবং 'হুতোম প্যাঁচার নকশা' ও 'গ্রামবার্তা প্রকাশিকা' কীভাবে তৎকালীন সমাজের আসল চিত্র তুলে ধরেছিল।
0/5
আন্দোলনের পর্যালোচনা ও সীমাবদ্ধতা (Critical Analysis & Limitations)
উনিশ শতকের নবজাগরণ ও সংস্কার আন্দোলনের সুদূরপ্রসারী প্রভাব এবং এই আন্দোলনের ভেতরের সীমাবদ্ধতাগুলোর গভীর ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ।
0/3
Class 10 History Ch 2: সংস্কার: বৈশিষ্ট্য ও পর্যালোচনা (সম্পূর্ণ নোটস ও প্রশ্নোত্তর)

Section A: অতি সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্নাবলী (SAQ – মান: ১)

(প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর একটি সম্পূর্ণ বাক্যে দাও)


১. প্রশ্ন: রাজা রামমোহন রায় কবে ব্রাহ্মসভা (যা পরে ব্রাহ্ম সমাজ হয়) প্রতিষ্ঠা করেন?

উত্তর: রাজা রামমোহন রায় ১৮২৮ সালে ব্রাহ্মসভা প্রতিষ্ঠা করেন।


২. প্রশ্ন: রাজা রামমোহন রায়ের প্রচেষ্টায় সতীদাহ প্রথা রদ আইন কত সালে পাশ হয়?

উত্তর: ১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ১৭ নম্বর রেগুলেশন জারি করে সতীদাহ প্রথা রদ করেন।


৩. প্রশ্ন: রাজা রামমোহন রায় সম্পাদিত একটি পত্রিকার নাম লেখো।

উত্তর: রাজা রামমোহন রায় সম্পাদিত একটি উল্লেখযোগ্য পত্রিকা হলো ‘সম্বাদ কৌমুদী’


৪. প্রশ্ন: হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও কবে হিন্দু কলেজের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন?

উত্তর: হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও ১৮২৬ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে হিন্দু কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন।


৫. প্রশ্ন: ডিরোজিওর অনুগামীদের কী বলা হতো?

উত্তর: ডিরোজিওর আদর্শে অনুপ্রাণিত ছাত্রদের ‘ইয়ং বেঙ্গল’ বা ‘নব্যবঙ্গ’ গোষ্ঠী বলা হতো।


৬. প্রশ্ন: অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন কে, কবে প্রতিষ্ঠা করেন?

উত্তর: ১৮২৮ সালে ডিরোজিও এবং তাঁর অনুগামীরা মিলে অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠা করেন।


৭. প্রশ্ন: বিধবা বিবাহ আইন কত খ্রিস্টাব্দে পাশ হয়?

উত্তর: ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে লর্ড ডালহৌসির আমলে ১৫ নম্বর আইন অনুযায়ী বিধবা বিবাহ আইন পাশ হয়।


৮. প্রশ্ন: নারীশিক্ষার প্রসারে বিদ্যাসাগর কার সহযোগিতায় ‘বেথুন স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন?

উত্তর: বিদ্যাসাগর নারীশিক্ষার প্রসারে জন এলিয়ট ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুনের সহযোগিতায় ‘বেথুন স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন।


৯. প্রশ্ন: বিদ্যাসাগরের উদ্যোগে প্রথম বিধবা বিবাহ কাদের মধ্যে সম্পন্ন হয়েছিল?

উত্তর: বিদ্যাসাগরের উদ্যোগে বাংলার প্রথম বিধবা বিবাহ শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন এবং কালীমতী দেবীর মধ্যে সম্পন্ন হয়েছিল।


১০. প্রশ্ন: শিকাগো বিশ্ব ধর্ম মহাসম্মেলনে স্বামী বিবেকানন্দ কবে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন?

উত্তর: ১৮৯৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর স্বামী বিবেকানন্দ শিকাগো বিশ্ব ধর্ম মহাসম্মেলনে ভাষণ দেন।


১১. প্রশ্ন: রামকৃষ্ণ মিশন কে, কত সালে প্রতিষ্ঠা করেন?

উত্তর: স্বামী বিবেকানন্দ ১৮৯৭ সালে মানবকল্যাণের উদ্দেশ্যে রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করেন।


১২. প্রশ্ন: ‘বর্তমান ভারত’ গ্রন্থটি কার রচনা?

উত্তর: ‘বর্তমান ভারত’ গ্রন্থটির রচয়িতা হলেন স্বামী বিবেকানন্দ


১৩. প্রশ্ন: কাকে ‘ভারতের বা বাংলার নবজাগরণের জনক’ বলা হয়?

উত্তর: राजा রামমোহন রায়কে বাংলার নবজাগরণের জনক বা ‘ভোরের পাখি’ বলা হয়।


১৪. প্রশ্ন: নব্যবঙ্গ দলের প্রকাশিত একটি মুখপত্রের নাম লেখো।

উত্তর: নব্যবঙ্গ দলের প্রকাশিত একটি উল্লেখযোগ্য মুখপত্র বা পত্রিকা হলো ‘জ্ঞানান্বেষণ’


১৫. প্রশ্ন: বিদ্যাসাগর কোন প্রাচীন শাস্ত্র উদ্ধৃত করে প্রমাণ করেন যে বিধবা বিবাহ শাস্ত্রসম্মত?

উত্তর: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ‘পরাশর সংহিতা’ উদ্ধৃত করে প্রমাণ করেছিলেন যে বিধবা বিবাহ সম্পূর্ণ শাস্ত্রসম্মত।


Section B: বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নাবলী (মান: ২)

(২-৩টি বাক্যে উত্তর দাও)

১. প্রশ্ন: রাজা রামমোহন রায়কে ‘বাংলার নবজাগরণের জনক’ বলা হয় কেন?

উত্তর: উনিশ শতকে মধ্যযুগীয় অন্ধত্ব ও স্থবিরতা থেকে বাঙালি সমাজকে আধুনিক যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানমনস্কতার পথে পরিচালিত করার প্রধান রূপকার ছিলেন রামমোহন রায়। শিক্ষা, ধর্ম ও সমাজ সংস্কারের মাধ্যমে তিনি আধুনিক ভারতের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন বলেই তাঁকে ‘নবজাগরণের জনক’ বলা হয়।


২. প্রশ্ন: আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রসারে রামমোহন রায়ের একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ লেখো।

উত্তর: আধুনিক বিজ্ঞান ও পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারের জন্য রামমোহন রায় ১৮২৩ সালে বড়লাট লর্ড আমহার্স্টকে একটি চিঠি লিখে ভারতে সংস্কৃত শিক্ষার পরিবর্তে ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞান শিক্ষার প্রবর্তনের আবেদন জানান।


৩. প্রশ্ন: সতীদাহ প্রথা রদ করার ক্ষেত্রে রামমোহন রায়ের যুক্তি কী ছিল?

উত্তর: রামমোহন রায় প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্র মন্থন করে প্রমাণ করেন যে, হিন্দু ধর্মে সতীদাহ বা সহমরণের কোনো সমর্থন নেই। তিনি যুক্তি দেন যে, এটি কোনো ধর্মীয় বিধান নয়, বরং নারীজাতির ওপর চাপিয়ে দেওয়া এক জঘন্য সামাজিক নিষ্ঠুরতা


৪. প্রশ্ন: অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য কী ছিল?

উত্তর: ডিরোজিও কর্তৃক ১৮২৮ সালে প্রতিষ্ঠিত অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশনের মূল উদ্দেশ্য ছিল হিন্দু কলেজের তরুণ ছাত্রদের মধ্যে যুক্তিবাদী ও স্বাধীন চিন্তার বিকাশ ঘটানো। এখানে ধর্ম, দর্শন ও সমাজব্যবস্থা নিয়ে মুক্তভাবে তর্ক-বিতর্ক করা হতো।


৫. প্রশ্ন: ‘নব্যবঙ্গ’ বা ‘ইয়ং বেঙ্গল’ গোষ্ঠী কাদের বলা হতো?

উত্তর: হিন্দু কলেজের অধ্যাপক হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিওর যুক্তিবাদী ও প্রগতিশীল আদর্শে অনুপ্রাণিত তরুণ ছাত্রদের একটি দল গড়ে ওঠে। ফরাসি বিপ্লবের সাম্য ও স্বাধীনতার আদর্শে দীক্ষিত এই র‍্যাডিক্যাল ছাত্রগোষ্ঠীকেই ইতিহাসে ‘ইয়ং বেঙ্গল’ বলা হয়।


৬. প্রশ্ন: নব্যবঙ্গ বা ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলনের দুটি সীমাবদ্ধতা লেখো।

উত্তর: এই আন্দোলনের দুটি সীমাবদ্ধতা হলো— প্রথমত, এই আন্দোলন মূলত কলকাতা-কেন্দ্রিক শিক্ষিত উচ্চবিত্ত যুবকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। দ্বিতীয়ত, পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রতি অন্ধ মোহ এবং দেশীয় ঐতিহ্যের প্রতি চরম অবজ্ঞা রক্ষণশীল সমাজকে ক্ষুব্ধ করেছিল।


৭. প্রশ্ন: নারীশিক্ষার প্রসারে বিদ্যাসাগরের দুটি অবদান উল্লেখ করো।

উত্তর: বিদ্যাসাগর উপলব্ধি করেছিলেন নারীশিক্ষা ছাড়া সমাজের প্রকৃত উন্নতি সম্ভব নয়। তিনি ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুনের সহায়তায় মেয়েদের জন্য ‘বেথুন স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিজ খরচে ও উদ্যোগে বাংলার বিভিন্ন জেলায় ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন।


৮. প্রশ্ন: বিধবা বিবাহ আন্দোলনে বিদ্যাসাগর কীভাবে শাস্ত্রীয় প্রমাণ ব্যবহার করেছিলেন?

উত্তর: রক্ষণশীল সমাজপতিদের প্রতিহত করতে বিদ্যাসাগর ‘পরাশর সংহিতা’ থেকে শ্লোক উদ্ধৃত করে প্রমাণ করেন যে, হিন্দুধর্মে বিধবা বিবাহ সম্পূর্ণ বৈধ ও শাস্ত্রসম্মত। তিনি আজীবন ব্রহ্মচর্য পালনের চেয়ে পুনর্বিবাহকে অনেক বেশি মানবিক বলে দাবি করেন।


৯. প্রশ্ন: বিদ্যাসাগরকে ‘দয়ার সাগর’ কেন বলা হয়?

উত্তর: বিদ্যাসাগর তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্যের জন্য যেমন পরিচিত ছিলেন, তেমনি আর্ত ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর ছিল অসীম করুণা ও ভালোবাসা। সমাজের শোষিত, দরিদ্র ও বিধবা নারীদের জন্য তিনি নিজের সর্বস্ব ত্যাগ করেছিলেন বলেই তাঁকে ‘দয়ার সাগর’ বলা হয়।


১০. প্রশ্ন: স্বামী বিবেকানন্দের ‘নব্য বেদান্ত’ (Neo-Vedanta) বলতে কী বোঝায়?

উত্তর: স্বামী বিবেকানন্দ শঙ্করাচার্যের প্রাচীন অদ্বৈত বেদান্তকে ব্যবহারিক রূপ দিয়ে সমাজসেবার আদর্শের সাথে যুক্ত করেন। তাঁর মতে, ঈশ্বর প্রতিটি মানুষের ভেতরেই আছেন, তাই আর্ত মানুষের নিঃস্বার্থ সেবাই হলো শ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক সাধনা; এই মানবতাবাদী দর্শনই হলো ‘নব্য বেদান্ত’


১১. প্রশ্ন: ‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর’—উক্তিটির তাৎপর্য কী?

উত্তর: এই উক্তিটির মাধ্যমে বিবেকানন্দ বোঝাতে চেয়েছেন যে, ঈশ্বরের আরাধনা কেবল মন্দিরে বা ধ্যানে সীমাবদ্ধ নয়। যেহেতু ঈশ্বরের অবস্থান প্রতিটি জীবের মধ্যে, তাই মানুষের সেবার মধ্য দিয়েই প্রকৃত ঈশ্বর উপাসনা সম্ভব।


১২. প্রশ্ন: রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠার প্রধান উদ্দেশ্য কী ছিল?

উত্তর: ১৮৯৭ সালে বিবেকানন্দ রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করেন। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল আধ্যাত্মিক প্রচারের পাশাপাশি জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে দরিদ্র, আর্ত ও পীড়িত মানুষের নিঃস্বার্থ সেবা (philanthropy) এবং শিক্ষার প্রসার ঘটানো।


Section C: ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নাবলী (মান: ৪)

(পয়েন্ট ভিত্তিক উত্তর)

১. প্রশ্ন: ব্রাহ্ম সমাজ প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ও সামাজিক প্রভাব কী ছিল?

উত্তর: ১৮২৮ সালে রাজা রামমোহন রায়ের প্রতিষ্ঠিত ব্রাহ্মসভা (পরবর্তীতে ব্রাহ্ম সমাজ) বাংলার সমাজ ও ধর্ম সংস্কারে গভীর প্রভাব ফেলে। এর মূল উদ্দেশ্য ও প্রভাবগুলি হলো:

  • একেশ্বরবাদ প্রচার: ব্রাহ্ম সমাজের মূল লক্ষ্য ছিল হিন্দু ধর্মের সমস্ত প্রকার পৌত্তলিকতা ও বহু ঈশ্বরবাদের অবসান ঘটিয়ে এক ও নিরাকার পরমব্রহ্মের উপাসনা করা।

  • ধর্মীয় গোঁড়ামির অবসান: মূর্তিপূজা, যজ্ঞ, এবং অন্ধবিশ্বাসের তীব্র বিরোধিতা করে ব্রাহ্ম সমাজ হিন্দু ধর্মের একটি পরিমার্জিত ও যুক্তিবাদী রূপ তুলে ধরে।

  • সামাজিক সংস্কার: ব্রাহ্ম সমাজ কেবল ধর্মে আবদ্ধ ছিল না, এটি সমাজ সংস্কারেও নেতৃত্ব দেয়।

    • সতীদাহ প্রথা রোধে জনমত গঠন।

    • বাল্যবিবাহের বিরোধিতা এবং নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা।

  • সর্বজনীনতা: রামমোহনের এই সমাজে সকল ধর্মের মানুষের প্রবেশের অধিকার ছিল, যা সমাজে ধর্মীয় উদারতা এবং পরমতসহিষ্ণুতা প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করেছিল।


২. প্রশ্ন: সতীদাহ প্রথা বিরোধী আন্দোলনে রামমোহন রায়ের ভূমিকা বিশ্লেষণ করো?

উত্তর: উনিশ শতকের সমাজ সংস্কারক হিসেবে রামমোহন রায়ের সবচেয়ে যুগান্তকারী কীর্তি হলো সতীদাহ প্রথা নিবারণ। তাঁর ভূমিকা ছিল বহুমুখী:

  • শাস্ত্রীয় বিচার: তিনি হিন্দু শাস্ত্র (যেমন- মনুস্মৃতি) মন্থন করে অকাট্য যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করেন যে, হিন্দু ধর্মে সতীদাহের কোনো স্বীকৃতি নেই।

  • জনমত গঠন: তিনি ‘সম্বাদ কৌমুদী’ পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখে এবং পুস্তিকা প্রচার করে এই নিষ্ঠুর প্রথার বিরুদ্ধে ব্যাপক জনমত গড়ে তোলেন।

  • সরাসরি বাধা দান: তিনি ও তাঁর অনুগামীরা শ্মশানে শ্মশানে ঘুরে গিয়ে বিধবাদের চিতায় উঠতে বাধা দিতেন এবং মানবিক আবেদন জানাতেন।

  • আইন পাস: তাঁর নিরলস সংগ্রামের ফলেই ১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ‘১৭ নম্বর রেগুলেশন’ জারি করে সতীদাহ প্রথাকে নিষিদ্ধ করেন।


৩. প্রশ্ন: হিন্দু সমাজে ডিরোজিও ও তাঁর নব্যবঙ্গ গোষ্ঠীর সংস্কারমূলক কার্যকলাপ আলোচনা করো।

উত্তর: উনিশ শতকের প্রথমার্ধে ডিরোজিও এবং তাঁর ইয়ং বেঙ্গল বা নব্যবঙ্গ গোষ্ঠী সমাজ সংস্কারে এক বৈপ্লবিক ভূমিকা গ্রহণ করেছিল:

  • কুসংস্কারের বিরোধিতা: তাঁরা সনাতন হিন্দু সমাজের অন্ধবিশ্বাস, মূর্তিপূজা এবং ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।

  • জাতিভেদ প্রথার ওপর আঘাত: বর্ণপ্রথা ও অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে তাঁরা তীব্র আন্দোলন করেন। জাতপাতের ভেদাভেদ ভাঙতে তাঁরা প্রথাগত রীতিনীতি বর্জন করতেন।

  • নারী মুক্তি ও শিক্ষা: এই গোষ্ঠী সতীদাহ ও বাল্যবিবাহের তীব্র সমালোচনা করে এবং নারী অধিকার ও নারীশিক্ষার পক্ষে জোরালো সওয়াল করে।

  • মুক্তচিন্তার প্রসার: * ‘অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন’ প্রতিষ্ঠা করে স্বাধীন বিতর্ক সভার আয়োজন।

    • ‘জ্ঞানান্বেষণ’‘এনকোয়ারার’ পত্রিকার মাধ্যমে যুক্তিবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রচার।


৪. প্রশ্ন: শিক্ষা বিস্তারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ভূমিকা আলোচনা করো।

উত্তর: শিক্ষার প্রসারে, বিশেষত আধুনিক ও নারী শিক্ষায় বিদ্যাসাগর মহাশয়ের অবদান অবিস্মরণীয়:

  • নারীশিক্ষা প্রসার: তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে নারীশিক্ষা ছাড়া সমাজের অগ্রগতি অসম্ভব। তিনি জন এলিয়ট ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুনের সাথে যৌথ উদ্যোগে ‘বেথুন স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং বাংলায় ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন।

  • শিক্ষাপদ্ধতির সংস্কার: সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে তিনি সেখানে অব্রাহ্মণ ছাত্রদের প্রবেশের অধিকার দেন এবং ইংরেজি ও আধুনিক গণিত শিক্ষার প্রবর্তন করেন।

  • বাংলা ভাষার আধুনিকীকরণ: বাংলা গদ্যের সরলীকরণ এবং শিশুদের সহজে বাংলা শেখানোর জন্য তিনি ‘বর্ণপরিচয়’, ‘কথামালা’, ‘বোধোদয়’-এর মতো কালজয়ী পাঠ্যপুস্তক রচনা করেন।

  • মডেল স্কুল স্থাপন: সাধারণ মানুষের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে তিনি বিভিন্ন জেলায় একাধিক মডেল স্কুল ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য নর্মাল স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।


৫. প্রশ্ন: সমাজ সংস্কারক হিসেবে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান (বিশেষত বিধবা বিবাহ আন্দোলন) সংক্ষেপে লেখো।

উত্তর: সমাজ সংস্কারক হিসেবে বিদ্যাসাগরের শ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো বিধবা বিবাহ প্রবর্তন:

  • বালবিধবাদের প্রতি করুণা: উনিশ শতকে বাল্যবিবাহের কারণে অসংখ্য বালিকা অকালেই বিধবা হতো। বিদ্যাসাগর এই নির্মম প্রথার অবসান ঘটাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন।

  • শাস্ত্রীয় প্রমাণ: তিনি ‘পরাশর সংহিতা’ থেকে প্রমাণ করেন যে, বিশেষ পরিস্থিতিতে বিধবাদের পুনর্বিবাহ হিন্দু ধর্মে শাস্ত্রসম্মত।

  • আইন পাস: তাঁর যুক্তিসমৃদ্ধ আবেদনপত্র এবং তীব্র আন্দোলনের ফলেই ১৮৫৬ সালে লর্ড ডালহৌসির আমলে ‘বিধবা বিবাহ আইন’ (Act XV) পাস হয়।

  • বাস্তব প্রয়োগ: নিজ খরচে তিনি বহু বিধবার বিবাহ দেন। সমাজকে পথ দেখাতে তিনি নিজ পুত্র নারায়ণ চন্দ্রের সাথে এক বিধবা কন্যার বিবাহ দিয়েছিলেন।


৬. প্রশ্ন: স্বামী বিবেকানন্দের ধর্ম সংস্কার বা নব্য বেদান্তের আদর্শ ব্যাখ্যা করো।

উত্তর: স্বামী বিবেকানন্দের ধর্মদর্শনের মূল ভিত্তি হলো ‘নব্য বেদান্ত’ (Neo-Vedanta):

  • প্রয়োগমূলক বেদান্ত: প্রাচীন বেদান্ত কেবল সন্ন্যাস ও মুক্তির কথা বলত। কিন্তু বিবেকানন্দ এই দর্শনকে এক ব্যবহারিক রূপ দেন—জগত মায়া নয়, বরং এটি কর্ম ও সেবার ক্ষেত্র।

  • শিবজ্ঞানে জীবসেবা: তাঁর নব্য বেদান্তের মূল মন্ত্র হলো—“জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর”। অর্থাৎ, আর্ত মানুষের সেবাই হলো শ্রেষ্ঠ ঈশ্বর উপাসনা।

  • সর্বজনীন ধর্ম: তিনি শিকাগো বিশ্ব ধর্ম সম্মেলনে (১৮৯৩) হিন্দু ধর্মকে সকল ধর্মের জননী হিসেবে তুলে ধরেন এবং সর্বজনীন ভ্রাতৃত্বের বার্তা দেন।

  • রামকৃষ্ণ মিশন: এই মানবতাবাদী আদর্শকে বাস্তবায়িত করতেই তিনি ১৮৯৭ সালে রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করেন।


৭. প্রশ্ন: জাতীয়তাবাদের বিকাশে ও চরিত্র গঠনে বিবেকানন্দের শিক্ষার ভূমিকা কী ছিল?

উত্তর: স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও জাতীয়তাবাদের বিকাশে সঞ্জীবনীর মতো কাজ করেছিল:

  • মানুষ গড়ার শিক্ষা: বিবেকানন্দ পুঁথিগত বিদ্যার চেয়ে ‘Man-making education’-এর ওপর জোর দেন। তিনি চরিত্র গঠন ও নৈতিকতার বিকাশে গুরুত্ব আরোপ করেন।

  • পেশীবহুল জাতীয়তাবাদ: তিনি শারীরিক দুর্বলতাকে পাপ মনে করতেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি, “গীতা পাঠ অপেক্ষা ফুটবল খেলিলে তোমরা স্বর্গের আরও নিকটবর্তী হইবে”

  • দেশপ্রেমের উন্মেষ: ভারতকে ভালোবেসে দেশমাতৃকার সেবায় আত্মনিয়োগ করার তাঁর এই ডাক ভারতের বিপ্লবীদের (যেমন- সুভাষচন্দ্র বসু) গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।


৮. প্রশ্ন: উনিশ শতকের বাংলায় পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারে রাজা রাধাকান্ত দেব ও ডেভিড হেয়ারের ভূমিকা কী ছিল?

উত্তর: বাংলার আধুনিক শিক্ষা বিস্তারে এই দুই ব্যক্তিত্বের অবদান অনস্বীকার্য:

  • ডেভিড হেয়ারের উদ্যোগ: * ১৮১৭ সালে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠায় তিনি প্রধান উদ্যোগী ছিলেন।

    • ‘ক্যালকাটা স্কুল বুক সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠা করে তিনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে কম মূল্যে বা বিনামূল্যে বই বিতরণের ব্যবস্থা করেন।

  • রাধাকান্ত দেবের ভূমিকা: * রক্ষণশীল হিন্দু নেতা হওয়া সত্ত্বেও তিনি আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রবল সমর্থক ছিলেন।

    • তিনি হিন্দু কলেজ ও স্কুল বুক সোসাইটি প্রতিষ্ঠায় ডেভিড হেয়ারকে সার্বিক সাহায্য করেছিলেন এবং স্ত্রীশিক্ষার প্রসারকেও সমর্থন জানিয়েছিলেন।


Section D: রচনাধর্মী বা প্রবন্ধমূলক প্রশ্নাবলী (মান: ৮)

(ভূমিকা, বিষয়বস্তুর বিস্তার ও উপসংহার সহ পূর্ণাঙ্গ উত্তর)

১. প্রশ্ন: উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের চরিত্র বা প্রকৃতি আলোচনা করো। এই আন্দোলনের সীমাবদ্ধতাগুলি কী ছিল?

উত্তর: ভূমিকা: উনিশ শতকে পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সংস্কৃতির সংস্পর্শে এসে বাংলার সমাজ, ধর্ম, শিক্ষা ও সাহিত্যে এক অভূতপূর্ব যুক্তিবাদী ও প্রগতিশীল চিন্তাধারার উন্মেষ ঘটে। মধ্যযুগীয় অন্ধত্ব ও স্থবিরতা কাটিয়ে আধুনিকতার পথে উত্তরণের এই যুগান্তকারী ঘটনাকেই ঐতিহাসিকরা ‘বাংলার নবজাগরণ’ বা ‘Bengal Renaissance’ বলে অভিহিত করেছেন। রাজা রামমোহন রায়কে এই নবজাগরণের ‘ভোরের পাখি’ বলা হয়।

বাংলার নবজাগরণের চরিত্র বা প্রকৃতি:

  • ১. যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানমনস্কতা: এই নবজাগরণের প্রধান ভিত্তি ছিল যুক্তিবাদ (Rationalism)। মানুষ চিরাচরিত প্রথা ও অন্ধবিশ্বাসকে অন্ধভাবে মেনে না নিয়ে সবকিছুকে যুক্তির কষ্টিপাথরে বিচার করতে শেখে।

  • ২. মানবতাবাদ: ইউরোপীয় রেনেসাঁর মতো বাংলার নবজাগরণেও মানবতাবাদ (Humanism) গুরুত্ব পায়। ধর্ম বা শাস্ত্রের চেয়ে মানুষের কল্যাণ ও আত্মমর্যাদাকেই সর্বোচ্চ স্থান দেওয়া হয়। সতীদাহ রদ বা বিধবা বিবাহের মতো সংস্কারগুলি মানবতাবাদেরই ফসল।

  • ৩. পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের মেলবন্ধন: এই নবজাগরণ কেবল পশ্চিমাদের অন্ধ অনুকরণ ছিল না। রামমোহন বা বিদ্যাসাগরের মতো মনীষীরা পাশ্চাত্যের আধুনিক বিজ্ঞানমনস্কতার সাথে প্রাচীন ভারতীয় বেদান্ত ও উপনিষদের শ্রেষ্ঠ দিকগুলির এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন।

  • ৪. বহুমুখী ব্যাপ্তি: এই জাগরণ শুধুমাত্র ধর্মে বা শিক্ষায় সীমাবদ্ধ ছিল না। সাহিত্য, সাংবাদিকতা, সমাজ সংস্কার থেকে শুরু করে রাজনীতি—সর্বত্রই এর প্রভাব পড়েছিল।

আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা বা ত্রুটি: ঐতিহাসিক বিনয় ঘোষ, অশোক মিত্র প্রমুখ পণ্ডিতরা এই নবজাগরণকে ‘তথাকথিত নবজাগরণ’ বা ‘এলিয়ট বা বাবুদের নবজাগরণ’ বলে সমালোচনা করেছেন। এর প্রধান কারণগুলি হলো:

  • ১. শহরকেন্দ্রিক ও উচ্চবিত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ: এই নবজাগরণ মূলত কলকাতা শহর এবং সংলগ্ন এলাকার শিক্ষিত, অভিজাত ও মধ্যবিত্ত হিন্দু সমাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। গ্রামের সাধারণ দরিদ্র কৃষক, শ্রমিক বা বৃহত্তর মুসলিম সমাজের সাথে এর কোনো সরাসরি যোগাযোগ ছিল না।

  • ২. ব্রিটিশ নির্ভরতা: নবজাগরণের নায়করা ব্রিটিশ শাসনকে ভারতের জন্য ‘ঐশ্বরিক আশীর্বাদ’ বলে মনে করতেন। তাঁরা ব্রিটিশদের অর্থনৈতিক শোষণের প্রকৃত রূপটি প্রথমদিকে উপলব্ধি করতে পারেননি।

  • ৩. হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদ: এই আন্দোলনের একাংশে (যেমন আর্য সমাজ বা পরবর্তী নব্য হিন্দু আন্দোলন) প্রাচীন হিন্দু ঐতিহ্যের প্রতি এত বেশি জোর দেওয়া হয়েছিল যে, তা অনেক ক্ষেত্রেই পরোক্ষভাবে মুসলিম সমাজকে এই মূল ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

উপসংহার: সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনস্বীকার্য। এটি ছিল একটি যুগসন্ধিক্ষণ, যা ভারতীয়দের মনে আধুনিক রাজনৈতিক চেতনা, দেশপ্রেম এবং অধিকারবোধের বীজ বপন করেছিল। এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই পরবর্তীতে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের গৌরবময় ইমারতটি গড়ে উঠেছিল।


২. প্রশ্ন: উনিশ শতকের বাংলার সমাজ সংস্কার আন্দোলনে রাজা রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ভূমিকার একটি তুলনামূলক আলোচনা করো।

উত্তর: ভূমিকা: উনিশ শতকের বাংলার ইতিহাসে অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রার দুই প্রধান কান্ডারি ছিলেন রাজা রামমোহন রায় এবং পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। রামমোহন রায় যদি বাংলার নবজাগরণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে থাকেন, তবে বিদ্যাসাগর সেই ভিত্তির ওপর আধুনিকতা ও মানবতাবাদের এক বিশাল ইমারত গড়ে তুলেছিলেন। সমাজ সংস্কারে উভয়েরই অবদান ছিল যুগান্তকারী, তবে তাঁদের কাজের ক্ষেত্র, কর্মপদ্ধতি ও দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্যও ছিল।

সমাজ সংস্কারে রামমোহন রায়ের ভূমিকা: রামমোহন রায় ছিলেন ভারতের আধুনিকতার পথিকৃৎ। তৎকালীন সমাজে হিন্দু নারীদের শোচনীয় অবস্থা তাঁকে ব্যথিত করেছিল। তাঁর সমাজ সংস্কারের শ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো সতীদাহ প্রথা নিবারণ। তিনি শাস্ত্র মন্থন করে এবং জনমত গঠন করে প্রমাণ করেন যে সতীদাহ কোনো ধর্মীয় প্রথা নয়। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টাতেই ১৮২৯ সালে লর্ড বেন্টিঙ্ক সতীদাহ প্রথাকে আইনত নিষিদ্ধ করেন। এছাড়া তিনি জাতিভেদ প্রথা, বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের তীব্র বিরোধিতা করেন এবং নারীর সম্পত্তির অধিকার নিয়ে জোরালো সওয়াল করেন।

সমাজ সংস্কারে বিদ্যাসাগরের ভূমিকা: বিদ্যাসাগর ছিলেন রামমোহনের সুযোগ্য উত্তরসূরি। তিনি নারীসমাজের দুঃখ-দুর্দশা মোচনে নিজের সমগ্র জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁর শ্রেষ্ঠ সমাজ সংস্কার হলো বিধবা বিবাহ প্রবর্তন। রামমোহনের মতোই তিনিও ‘পরাশর সংহিতা’ থেকে শাস্ত্রীয় যুক্তি দিয়ে ১৮৫৬ সালে ‘বিধবা বিবাহ আইন’ পাস করান। শুধু আইন পাস নয়, চরম সামাজিক বাধা উপেক্ষা করে নিজ খরচে বহু বিধবার বিবাহ দেন। এছাড়া নারীশিক্ষার প্রসারে ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় এবং ‘বেথুন স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন।

তুলনামূলক বিশ্লেষণ (পার্থক্য ও সাদৃশ্য):

  • ১. ধর্মীয় বনাম ইহজাগতিক দৃষ্টিভঙ্গি: রামমোহন রায়ের সমাজ সংস্কারের প্রেরণা এসেছিল তাঁর একেশ্বরবাদী ধর্মচিন্তা থেকে। তিনি ব্রাহ্ম সমাজ প্রতিষ্ঠা করে ধর্মসংস্কারের মাধ্যমে সমাজ সংস্কার করতে চেয়েছিলেন। অন্যদিকে, বিদ্যাসাগর ছিলেন পুরোপুরি মানবতাবাদী ও ইহজাগতিক মানুষ। ধর্ম বা পরকালের চেয়ে মানুষের চোখের জল মোছানোই তাঁর কাছে প্রধান ছিল।

  • ২. পাশ্চাত্য বনাম প্রাচ্যের প্রভাব: রামমোহন রায় অনেক বেশি পাশ্চাত্য দর্শনে প্রভাবিত ছিলেন এবং ব্রিটিশদের সাথে তাঁর সুসম্পর্ক ছিল। বিদ্যাসাগর ইংরেজি ও আধুনিক শিক্ষায় বিশ্বাসী হলেও জীবনযাপনে ছিলেন নিখাদ বাঙালি এবং ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি একাধিকবার গর্জে উঠেছিলেন।

  • ৩. কর্মপদ্ধতি: রামমোহন ছিলেন একজন দার্শনিক ও তাত্ত্বিক, যিনি উপরমহলে বসে সংস্কারের রূপরেখা তৈরি করেছিলেন। অপরদিকে বিদ্যাসাগর ছিলেন আপাদমস্তক একজন কর্মবীর (Action-oriented), যিনি সরাসরি মাঠে নেমে সাধারণ মানুষের সাথে মিশে কাজ করেছেন।

উপসংহার: উপসংহারে বলা যায়, রামমোহন এবং বিদ্যাসাগর উভয়েই ছিলেন উনিশ শতকের বাংলার দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র। রামমোহনের যুক্তিবাদী সংস্কার আন্দোলনের যে ধারা শুরু হয়েছিল, বিদ্যাসাগরের হৃদয়বত্তা ও দৃঢ়তায় তা পূর্ণতা লাভ করে। এই দুই যুগমানবের মিলিত প্রচেষ্টাতেই বাঙালি সমাজ মধ্যযুগীয় স্থবিরতা কাটিয়ে আধুনিক ভারতের পথে পা বাড়িয়েছিল।


৩. প্রশ্ন: উনিশ শতকের বাংলার ধর্ম ও সমাজ সংস্কার আন্দোলনে শ্রীরামকৃষ্ণ ও স্বামী বিবেকানন্দের অবদান মূল্যায়ন করো। কীভাবে তা জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটিয়েছিল?

উত্তর: ভূমিকা: উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি এবং ব্রাহ্ম আন্দোলনের প্রভাবে হিন্দু সমাজ যখন নিজস্ব পরিচয় নিয়ে সংকটে ভুগছিল, তখন দক্ষিণেশ্বরের সাধক শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব এবং তাঁর সুযোগ্য শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ হিন্দু ধর্মের এক গৌরবময় ও মানবতাবাদী রূপ বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেন। তাঁদের ধর্ম ও সমাজ সংস্কার ভারতের আধ্যাত্মিক জাগরণের পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী চেতনারও উন্মেষ ঘটিয়েছিল।

শ্রীরামকৃষ্ণের সর্বধর্ম সমন্বয়ের আদর্শ: শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব কোনো পুঁথিগত বিদ্যায় শিক্ষিত ছিলেন না, কিন্তু তাঁর সহজ-সরল জীবনদর্শন ও বাণী শিক্ষিত বাঙালি সমাজকে গভীরভাবে আলোড়িত করে।

  • যত মত, তত পথ: তিনি বিভিন্ন ধর্ম সাধনা করে এই উপসংহারে পৌঁছান যে, হিন্দু, ইসলাম বা খ্রিস্টান—সব ধর্মেরই গন্তব্য এক ও অদ্বিতীয় ঈশ্বর। তাঁর এই ‘যত মত তত পথ’ বাণী সমাজে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা দূর করে সর্বধর্ম সমন্বয়ের এক অপূর্ব বাতাবরণ সৃষ্টি করেছিল।

  • জীবে শিব জ্ঞান: তিনি প্রচার করেন যে, জীব ও শিব অভিন্ন। তাই মানুষের প্রতি দয়া নয়, ঈশ্বর জ্ঞানে মানুষের সেবা করাই হলো শ্রেষ্ঠ ধর্ম। এই দর্শনই পরবর্তীতে বিবেকানন্দের সমাজসেবার ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।

স্বামী বিবেকানন্দ ও নব্য বেদান্ত: গুরুর আদর্শকে স্বামী বিবেকানন্দ সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে দেন।

  • নব্য বেদান্ত: বিবেকানন্দ শঙ্করাচার্যের অদ্বৈত বেদান্তকে কেবল সন্ন্যাসের তত্ত্বে আটকে না রেখে তাকে ব্যবহারিক জীবনে প্রয়োগ করেন, যাকে ‘নব্য বেদান্ত’ বা Practical Vedanta বলা হয়। তিনি বলেন, জগতের মায়া থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়, বরং এই জগতেই দরিদ্র ও পীণ্ডিত মানুষের সেবার মাধ্যমে ঈশ্বর লাভ সম্ভব।

  • রামকৃষ্ণ মিশন: এই সেবার আদর্শকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতেই ১৮৯৭ সালে তিনি ‘রামকৃষ্ণ মিশন’ প্রতিষ্ঠা করেন। এর মূল কাজ হয়ে দাঁড়ায় দুর্ভিক্ষ, মহামারী এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং শিক্ষাবিস্তার।

জাতীয়তাবাদের উন্মেষ: বিবেকানন্দের ধর্ম সংস্কার কেবল আধ্যাত্মিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তা ভারতীয়দের মনে প্রবল দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের জন্ম দিয়েছিল।

  • आत्मবিশ্বাসের জাগরণ: ১৮৯৩ সালে শিকাগো ধর্ম সম্মেলনে হিন্দুধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের মাধ্যমে তিনি পরাধীন ও হীনম্মন্যতায় ভোগা ভারতবাসীদের মনে এক বিপুল আত্মবিশ্বাস ও গরিমা জাগিয়ে তোলেন।

  • পেশীবহুল জাতীয়তাবাদ: তিনি দেশের যুবসমাজকে দুর্বলতা ঝেড়ে ফেলে সাহসী ও বলীয়ান হওয়ার ডাক দেন। তাঁর এই পেশীবহুল ও পৌরুষদীপ্ত জাতীয়তাবাদ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে, বিশেষত চরমপন্থী বিপ্লবীদের কাছে গীতাস্বরূপ হয়ে উঠেছিল।

উপসংহার: শ্রীরামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দের এই আন্দোলন কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল না, কিন্তু তা ভারতের সমাজ ও রাজনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল। শ্রীরামকৃষ্ণের আধ্যাত্মিক সমন্বয়বাদ এবং স্বামী বিবেকানন্দের মানবতাবাদী নব্য বেদান্ত দর্শন ঘুমন্ত ভারতকে জাগ্রত করে এক নতুন, আত্মনির্ভরশীল ও জাতীয়তাবাদী ভারতের ভিত্তি স্থাপন করেছিল।

0% Complete