ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও বিধবা বিবাহ আন্দোলন
ভূমিকা: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের পরিচিতি
ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় এক প্রখ্যাত পণ্ডিত বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রপিতামহ ভুবনেশ্বর বিদ্যালঙ্কার এবং পিতামহ রামজয় তর্কভূষণ সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত ছিলেন। তাঁর পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় চরম দারিদ্র্যের মধ্যে কলকাতায় মাসিক মাত্র দশ টাকা বেতনে কাজ করতেন।
সংস্কৃত কলেজে দীর্ঘ বারো বছর অধ্যয়ন করে ঈশ্বরচন্দ্র অসামান্য পাণ্ডিত্যের অধিকারী হন এবং ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধিতে ভূষিত হন। তিনি কেবল একজন শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতই ছিলেন না, বরং এক পরম মানবতাবাদী, যুক্তিবাদী ও মহান সমাজ সংস্কারক হিসেবে বাংলার বুকে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
উনিশ শতকে বিধবাদের অবস্থা
উনিশ শতকের বাংলার হিন্দু সমাজের অন্যতম কলঙ্কিত দিক ছিল নারীদের, বিশেষত বালবিধবাদের শোচনীয় অবস্থা। সে যুগে সমাজে বাল্যবিবাহের চরম প্রাবল্য থাকায় অসংখ্য শিশু কন্যা অকালেই বিধবা হতো এবং তাদের আজীবন ‘ব্রহ্মচর্য’ পালন করতে হতো।
समाजপতিদের চাপে এই বিধবা নারীদের অত্যন্ত কঠোর, নির্মম ও অমানবিক জীবনযাপন করতে হতো। বিদ্যাসাগর অত্যন্ত বেদনাহত হয়ে লিখেছিলেন যে, পতিবিয়োগ হলে সমাজ মনে করত নারীদেহের শরীর পাষাণময় হয়ে যায় এবং তাদের কোনো দুঃখ-কষ্ট বা যন্ত্রণা থাকতে পারে না। দেশের এমন করুণ সামাজিক চিত্র তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।
বিধবা বিবাহ প্রবর্তনের আন্দোলন
সতীদাহ প্রথা রদ হওয়ার প্রায় চব্বিশ বছর পর বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহ প্রচলনের আন্দোলন শুরু করেন। ১৮৫৪ সালে তিনি “বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কি না এতদবিষয়ক প্রস্তাব” নামক একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে এই আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক সূত্রপাত ঘটান।
তিনি প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্র মন্থন করে অকাট্য যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করেন যে, হিন্দুধর্মে বিধবা বিবাহ সম্পূর্ণ শাস্ত্রসম্মত। পরাশর সংহিতার মতো প্রাচীন শাস্ত্রের শ্লোক উদ্ধৃত করে তিনি সমাজকে বোঝাতে সক্ষম হন যে, আজীবন কষ্টকর ব্রহ্মচর্য পালনের চেয়ে বিধবা নারীদের পুনর্বিবাহ অনেক বেশি মানবিক ও পবিত্র।
আবেদনপত্র ও আইনি সংগ্রাম
বিধবা বিবাহকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার লক্ষ্যে বিদ্যাসাগর ব্রিটিশ সরকারের কাছে এক ঐতিহাসিক আবেদনপত্র বা পিটিশন জমা দেন, যেখানে ৯৮৭ জন বিশিষ্ট মানুষের স্বাক্ষর ছিল। এর তীব্র বিরোধিতা করে রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের নেতা রাধাকান্ত দেব পাল্টা একটি পিটিশন জমা দিয়েছিলেন।
কিন্তু বিদ্যাসাগরের অকাট্য যুক্তি ও নিরলস সংগ্রামের কাছে রক্ষণশীলরা হার মানে। অবশেষে ১৮৫৬ সালের ২৬শে জুলাই লর্ড ডালহৌসির আমলে ১৫ নম্বর আইন (Act XV of 1856) অনুযায়ী ‘বিধবা বিবাহ আইন’ পাস হয় এবং বিধবা বিবাহ আইনি বৈধতা লাভ করে।
বাস্তব রূপায়ণ ও ব্যক্তিগত আত্মত্যাগ
আইন পাস হওয়ার পরই বিদ্যাসাগরের জীবনের সবচেয়ে কঠিন সংগ্রাম শুরু হয়। আইনসম্মত হওয়া সত্ত্বেও মানুষ যখন বিধবাবিবাহ দিতে পিছপা হচ্ছিল, তখন তাঁরই নিজস্ব উদ্যোগে এবং উপস্থিতিতে শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন এবং কালীমতী দেবীর মধ্যে বাংলার প্রথম বিধবা বিবাহ সম্পন্ন হয়।
समाजকে পথ দেখাতে তিনি নিজ পুত্র নারায়ণ চন্দ্রের সাথেও এক বিধবা কন্যার বিবাহ দিয়েছিলেন। এই মহৎ কার্য সম্পন্ন করতে গিয়ে, এবং নিজ খরচে বহু বিধবার বিবাহ দিতে গিয়ে তিনি প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন এবং বিশাল ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েন।
নারীশিক্ষায় অবদান
বিদ্যাসাগর মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন যে, নারীশিক্ষার প্রসার ছাড়া নারী সমাজের প্রকৃত অগ্রগতি ও মুক্তি কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ১৮৪৯ সালের ৭ই মে তিনি জন এলিয়ট ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুনের সাথে যৌথ উদ্যোগে মেয়েদের জন্য ‘বেথুন স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন।
শিক্ষাবিভাগের পরিদর্শকের দায়িত্ব পেয়ে নারীশিক্ষার বিস্তারে তিনি ১৮৫৭ থেকে ১৮৫৮ সালের মধ্যে বাংলার নদীয়া, বর্ধমান, হুগলি ও মেদিনীপুর জেলায় নিজ উদ্যোগে ও খরচে মোট ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন।
সামাজিক বিরোধিতা
এই যুগান্তকারী সংস্কারমূলক কাজের জন্য বিদ্যাসাগরকে রক্ষণশীল গোঁড়া হিন্দু সমাজের তীব্র আক্রমণ, অপবাদ এবং বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। তৎকালীন সমাজের সমাজপতিরা তাঁকে নানাভাবে প্রতিহত করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বিদ্যাসাগর ছিলেন যুক্তিবাদী এবং হৃদয়বান মানুষ। শত বাধা ও প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তিনি তাঁর সংকল্পে পাহাড়ের মতো অবিচল ছিলেন এবং পিছু হটেননি।
ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও উত্তরাধিকার
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্যের জন্য যেমন ‘বিদ্যার সাগর’ হিসেবে পরিচিত, তেমনি আর্ত ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর অসীম করুণা ও ভালোবাসার জন্য তিনি ‘দয়ার সাগর’ নামেও বাঙালির হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। তিনি বাঙালি সমাজের স্থবিরতা ভেঙে তাতে আধুনিকতা ও মানবিকতার স্রোত প্রবাহিত করেছিলেন। তাঁর প্রবর্তিত বিধবা বিবাহ আইন, নারী অধিকার রক্ষা এবং শিক্ষাবিস্তারের প্রয়াস উনিশ শতকের বাংলার সমাজকাঠামোকে আমূল রূপান্তরিত করে এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল।