২০২৬ মাধ্যমিক বাংলা প্রশ্ন উত্তর (Solved)
১. সঠিক উত্তরটি নির্বাচন করো: [১৭ × ১ = ১৭]
২. কম-বেশি ২০টি শব্দে নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও: [১৯ × ১ = ১৯]
২.১ যে-কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও: [৪ × ১ = ৪]
২.১.১ “-কী আশ্চর্য! চমকে ওঠে ভবতোষ!”- ভবতোষের চমকে ওঠার কারণ কী? [১]
উত্তর: জগদীশবাবুর বাড়িতে আগত এক অদ্ভুত সন্ন্যাসীর পায়ের ধুলো পাওয়ার জন্য স্বয়ং জগদীশবাবু কাঠের খড়মে একশো টাকার নোট গুঁজে দিয়েছিলেন— এ কথা শুনেই হরিদার ঘরে আড্ডায় বসা ভবতোষ তীব্র বিস্ময়ে চমকে উঠেছিল।
উৎস: প্রখ্যাত কথাশিল্পী সুবোধ ঘোষ রচিত ছোটোগল্প ‘বহুরূপী’।
২.১.২ অমৃতের বয়স কত? [১]
উত্তর: প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক পান্নালাল প্যাটেলের গল্প অনুযায়ী অমৃত এবং তার পরম বন্ধু ইসাব উভয়ের বয়সই ছিল সমবয়সী, অর্থাৎ দশ বছর।
উৎস: গুজরাতি সাহিত্যিক পান্নালাল প্যাটেল রচিত এবং অর্ঘ্যকুসুম দত্তগুপ্ত অনূদিত ছোটোগল্প ‘অদল বদল’।
২.১.৩ “এই ভীষণ মধুর শব্দ শুনিতে শুনিতে সর্বাঙ্গ অবশ, অবসন্ন হইয়া আসিতেছে।”— কোন্ ‘ভীষণ মধুর শব্দ’ উদ্দিষ্ট ব্যক্তিকে অবসন্ন করেছিল? [১]
উত্তর: প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি স্রোতে ফুলেফেঁপে ওঠা উম্মত্ত নদের জলতরঙ্গের অবিশ্রান্ত গর্জন ও তীব্র কল্লোলধ্বনিকে এখানে ‘ভীষণ মধুর শব্দ’ বলা হয়েছে, যা নদেরচাঁদকে মোহাচ্ছন্ন ও অবসন্ন করে তুলেছিল।
উৎস: কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত মনস্তাত্ত্বিক ছোটোগল্প ‘নদীর বিদ্রোহ’।
২.১.৪ “মুখ ফিরাইয়া হাসি গোপন করিল”— হাসি গোপন করার কারণ কী? [১]
উত্তর: রাজদ্রোহী সব্যসাচী মল্লিক সন্দেহে ধৃত গিরীশ মহাপাত্রের অদ্ভুত পোশাক-পরিচ্ছদ, তৈলাক্ত মাথার বাহারি চুল এবং তার সার্বিক সং সাজা কিম্ভূত চেহারা দেখে সাব-ইন্সপেক্টর নিমাইবাবু ও জগদীশবাবুর সামনে পুলিশ কর্মী রামদাস তেওয়ারি মুখ ফিরিয়ে হাসি গোপন করেছিল।
উৎস: কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত রাজনৈতিক উপন্যাস ‘পথের দাবী’ (অংশবিশেষ)।
২.১.৫ “সারা বাড়িতে শোরগোল পড়ে যায়,”— কী নিয়ে শোরগোল পড়ে? [১]
উত্তর: তপনের নিজের লেখা প্রথম মৌলিক গল্প ‘প্রথম দিন’ যখন নতুন মেসোমশাইয়ের সহায়তায় সন্ধ্যাতারা পত্রিকায় ছাপার অক্ষরে আত্মপ্রকাশ করে, তখন সেই অবিশ্বাস্য কীর্তি দেখে সমস্ত বাড়িতে তীব্র শোরগোল ও আনন্দের আলোড়ন পড়ে যায়।
উৎস: খ্যাতনামা লেখিকা আশাপূর্ণা দেবী রচিত ছোটোগল্প ‘জ্ঞানচক্ষু’।
২.২ যে-কোনো চারটি প্রশ্নের উত্তর দাও: [৪ × ১ = ৪]
২.২.১ “দণ্ডচারি এই মতে”— এক দণ্ড মানে কত সময়? [১]
উত্তর: সনাতন প্রাচীন ভারতীয় সময় গণনার পরিমাপ অনুযায়ী এক দণ্ড বলতে বোঝায় ৬০ পল বা আধুনিক সময় হিসেবে ২৪ মিনিট।
উৎস: মধ্যযুগের বিশিষ্ট কবি সৈয়দ আলাওল রচিত পদ্মাবতী কাব্যের অন্তর্গত পাঠ্য কবিতা ‘সিন্ধুতীরে’।
২.২.২ “ক্ষমা করো”-এই উক্তির মধ্যে দিয়ে কবির কী মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে? [১]
উত্তর: সাম্রাজ্যবাদী শ্বেতাঙ্গ সভ্যতার হিংস্র লুণ্ঠন ও পাশবিক অত্যাচারের বিপরীতে দাঁড়িয়ে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আফ্রিকায় নির্যাতিত মানবাত্মার কাছে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের পক্ষ থেকে আন্তরিক অনুশোচনা, আত্মশুদ্ধি ও শাশ্বত মানবতার চিরন্তন ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন।
উৎস: বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘পত্রপুট’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত কবিতা ‘আফ্রিকা’।
২.২.৩ “প্রণমিয়া, ধাত্রীর চরণে,”— এই ‘ধাত্রীর’ পরিচয় দাও। [১]
উত্তর: পাঠ্য কাব্যাংশে ধাত্রী হলেন বীর মেঘনাদের স্নেহময়ী ধাইমা প্রভাসা; তবে লঙ্কার সর্বনাশা দুঃসংবাদ পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে দেবী লক্ষ্মী স্বয়ং ছদ্মবেশ ধারণ করে এই ধাত্রী প্রভাসার রূপেই ইন্দ্রজিতের প্রমোদোদ্যানের কনকবলয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন।
উৎস: মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত ‘মেঘনাদবধ কাব্য’-এর প্রথম সর্গ থেকে সংকলিত ‘অভিষেক’ কবিতা।
২.২.৪ “সমস্ত সমতলে ধরে গেল আগুন”— আগুন ধরার কারণ কী? [১]
উত্তর: তথাকথিত সভ্য পৃথিবীর সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন, রক্তের বিষাক্ত কাঠগড়া ও সামরিক যুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসলীলায়— রক্তে ভেজা আগ্নেয়াস্ত্রের বোমার আঘাতে সমস্ত সবুজ ও প্রাণবন্ত সমতলে দাবানলের মতো আগুন ধরে গিয়েছিল।
উৎস: চিলিয়ান কবি পাবলো নেরুদা রচিত এবং নবারুণ ভট্টাচার্য অনূদিত কবিতা ‘অসুখী একজন’।
২.২.৫ “আমাদের পথ নেই আর”- তাহলে আমাদের কী করণীয়? [১]
উত্তর: চারপাশের সর্বগ্রাসী যুদ্ধ, স্বজনহারানো ধ্বংসস্তূপ ও রাজনৈতিক বিপন্নতায় বেঁচে থাকার সব পথ রুদ্ধ হয়ে যাওয়ায় কবি সমস্ত সাধারণ মানুষকে জাত-পাত ভুলে একতাবদ্ধ হয়ে হাতে হাত ধরে পরস্পরকে আঁকড়ে বাঁচতে বলেছেন।
উৎস: কবি শঙ্খ ঘোষ রচিত ‘জলই পাষাণ হয়ে আছে’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ‘আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি’ কবিতা।
২.৩ যে-কোনো তিনটি প্রশ্নের উত্তর দাও: [৩ × ১ = ৩]
২.৩.১ “তুমি সবল, আমি দুর্বল। তুমি সাহসী, আমি ভীরু।”- এখানে ‘তুমি’ বলতে লেখক আসলে কাকে ইঙ্গিত করেছেন? [১]
উত্তর: উদ্ধৃত অংশে ‘তুমি’ বলতে প্রাবন্ধিক শ্রীপান্থ ধাতুর তৈরি কলম তথা আধুনিককালের শক্তিশালী ব্রোঞ্জের সূক্ষ্ম মুখযুক্ত নিব-কে উদ্দেশ্য করে রূপকচ্ছলে সম্বোধন করেছেন।
উৎস: প্রাবন্ধিক শ্রীপান্থ (নিখিল সরকার) রচিত মননশীল প্রবন্ধ ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’।
২.৩.২ “যিনি কানে কলম গুঁজে দুনিয়া খোঁজেন,” তাকে কী বলে? [১]
উত্তর: যিনি অসাবধানতায় কানে কলম গুঁজে রেখে সমস্ত দুনিয়াময় সেই কলম খুঁজে বেড়ান, প্রাবন্ধিকের ভাষায় তাকে কৌতুকচ্ছলে ‘দার্শনিক’ বলে অভিহিত করা হয়েছে।
উৎস: শ্রীপান্থ ছদ্মনামে নিখিল সরকার রচিত স্মৃতিকথামূলক প্রবন্ধ ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’।
২.৩.৩ “বিজ্ঞান চর্চায় এখনও নানা রকম বাধা আছে”— কোন্ বিষয়ে এখনও বাধা আছে? [১]
উত্তর: বঙ্গদেশে উচ্চশিক্ষিত সাধারণ মানুষের মধ্যে অনেকেই ইংরেজিতে সড়গড় হলেও মাতৃভাষা বাংলায় উপযুক্ত বিজ্ঞানের পরিভাষা, বিজ্ঞানমনস্ক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাংলা ভাষায় যথার্থ বিজ্ঞান বিষয়ক প্রামাণ্য রচনার অভাবের দরুন বিজ্ঞান চর্চায় নানা প্রকার বাধার সৃষ্টি হয়।
উৎস: বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও রসায়নবিদ রাজশেখর বসু (পরশুরাম) রচিত বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ ‘বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান’।
২.৩.৪ কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিভাষা সমিতির সঙ্গে কারা কাজ করেছিলেন? [১]
উত্তর: কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিভাষা সমিতির সঙ্গে বিশিষ্ট বিজ্ঞান অধ্যাপক, ভাষাতত্ত্ববিদ, সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত এবং কয়েকজন খ্যাতনামা সাহিত্যিক যৌথভাবে যুক্ত হয়ে একযোগে কাজ করেছিলেন।
উৎস: রাজশেখর বসু রচিত তথ্যনিষ্ঠ প্রবন্ধ ‘বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান’।
২.৪ যে-কোনো আটটি প্রশ্নের উত্তর দাও: [৮ × ১ = ৮]
২.৪.১ অনুক্ত কর্তা কাকে বলে? [১]
উত্তর: যে বাচ্যে (কর্মবাচ্য বা ভাববাচ্যে) কর্তা প্রধানরূপে বা প্রত্যক্ষভাবে উক্ত না হয়ে কর্ম বা ভাব মুখ্য হয়ে ওঠে এবং কর্তা অপ্রধান থাকে, তাকে অনুক্ত কর্তা বলে।
যেমন: রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক ‘গীতাঞ্জলি’ রচিত হয়েছে।
২.৪.২ জনে জনে নিমন্ত্রণ করেছি— নিম্নরেখ পদটি কী জাতীয় কর্ম? [১]
উত্তর: ‘জনে জনে’ পদটি পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে ব্যাপ্তি বা পৌনঃপুনিকতা প্রকাশ করায় এটি বীপ্সামূল বা বিপ্সিত কর্ম (বা কর্মের বীপ্সা)।
২.৪.৩ ‘আকাশবাণী’— সমাসবদ্ধ পদটির ব্যাসবাক্য সহ সমাসের নাম লেখো। [১]
উত্তর:
-
ব্যাসবাক্য: আকাশ হতে আগত বাণী / আকাশজাত বাণী (অথবা আকাশের বাণী)।
-
সমাসের নাম: মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস (অথবা সম্বন্ধ তৎপুরুষ সমাস)।
২.৪.৪ দ্বিগু সমাসের একটি উদাহরণ দাও। [১]
উত্তর:
-
উদাহরণ: তেমাথা = তিন মাথার সমাহার।
২.৪.৫ অলোপ সমাস কাকে বলে? [১]
উত্তর: যে সমাসে সমস্যমান পদের পূর্বপদের বিভক্তি সমস্তপদে বা সমাসবদ্ধ পদে লুপ্ত না হয়ে অপরিবর্তিত থাকে, তাকে অলোপ সমাস বলে।
যেমন: চোখে মুখে = চোখে-মুখে।
২.৪.৬ বাক্য নির্মাণের শর্তগুলির নাম উল্লেখ করো। [১]
উত্তর: সার্থক বাক্য নির্মাণের আবশ্যক তিনটি মূল শর্ত হলো:
১. যোগ্যতা
২. আকাঙ্ক্ষা
৩. আসত্তি (বা নৈকট্য)।
২.৪.৭ ‘হয় বাংলা পড়ো, নয় ইংরেজি পড়ো।’— যৌগিক বাক্যে পরিবর্তন করো। [১]
উত্তর: বাংলা পড়ো অথবা ইংরেজি পড়ো (বা, বাংলা পড়ো নতুবা ইংরেজি পড়ো)।
২.৪.৮ আবেগসূচক বাক্যের একটি উদাহরণ দাও। [১]
উত্তর:
-
উদাহরণ: বাঃ! কী চমৎকার দৃশ্য! (বা, হায়! লোকটির কী নিদারুণ দুর্দশা!)
২.৪.৯ ‘বাড়িতে খবর দিয়েছেন।’— কর্মবাচ্যে রূপান্তর করো। [১]
উত্তর: বাড়িতে খবর দেওয়া হয়েছে।
২.৪.১০ কর্মকর্তৃবাচ্যের একটি উদাহরণ দাও। [১]
উত্তর:
-
উদাহরণ: শাঁখ বাজে। (বা, ঘণ্টা বাজে— এখানে কর্মপদ স্বয়ং কর্তার ন্যায় প্রতীয়মান হয়)।
৩. প্রসঙ্গ নির্দেশসহ কম-বেশি ৬০ টি শব্দে উত্তর দাও: [৩ + ৩ = ৬]
৩.১ যে-কোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও: [১ × ৩ = ৩]
৩.১.১ “শুনেছেন, হরিদা, কী কাণ্ড হয়েছে?”- কারা একথা বলেছেন? ‘কাণ্ডটা কী ছিল? [১+২]
উত্তর:
বক্তা:
উদ্ধৃত প্রশ্নসূচক উক্তিটি করেছেন হরিদার ছোট্ট ঘরের সান্ধ্য আড্ডায় উপস্থিত তাঁর পরিচিত ভক্ত ও অনুগামীরা (ভবতোষ, অনাদি প্রমুখ)।
উৎস: প্রখ্যাত কথাশিল্পী সুবোধ ঘোষ রচিত ছোটোগল্প ‘বহুরূপী’।
কাণ্ডের বিবরণ:
শহরের অত্যন্ত ধনী কিন্তু কৃপণ স্বভাবের ব্যক্তি জগদীশবাবুর বাড়িতে এক সাতদিনের জন্য এক জবরদস্ত উচ্চমার্গের সন্ন্যাসী এসে উঠেছিলেন। সেই হিমালয়বাসী সাধুর বয়স ছিল হাজার বছরেরও বেশি এবং তিনি সারাবছর কেবল একটিমাত্র হরীতকী খেতেন। জগদীশবাবু ছাড়া আর কাউকে তিনি পদধূলি নিতে দেননি। অবশেষে চতুর জগদীশবাবু একজোড়া কাঠের খড়মে একশো টাকার একটি চকচকে নোট গুঁজে সন্ন্যাসীর চরণে ধরে তাঁর বহু আকাঙ্খিত পায়ের ধুলো সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন। এক বৈরাগীর প্রতি কৃপণ জগদীশবাবুর এই বিপুল অর্থব্যয় এবং ভক্তিমত্তার ঘটনাই ছিল উল্লিখিত ‘কাণ্ড’।
৩.১.২ “একটু মমতা বোধ করিল বটে,”- কীসের প্রতি কার ‘মমতা বোধ’ হয়েছিল? তার মমতা বোধের কারণ কী? [১+২]
উত্তর:
মমতা বোধের পাত্র ও ব্যক্তি:
কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটোগল্পে উদ্ধৃত অংশে নতুন তৈরি হওয়া ইট-লোহা-পাথরের মজবুত রেলব্রিজটির প্রতি প্যাসেঞ্জার ট্রেনের অভিজ্ঞ স্টেশন মাস্টার নদেরচাঁদের মনে মমতা বোধ জেগে উঠেছিল।
উৎস: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত মনস্তাত্ত্বিক ছোটোগল্প ‘নদীর বিদ্রোহ’।
মমতা বোধের কারণ:
নদেরচাঁদ ছিল আজন্ম নদীপ্রেমিক এক সংবেদনশীল মানুষ। নদীর চিরন্তন বয়ে চলা স্রোত ও জলতরঙ্গ ছিল তার প্রাণের দোসর। কিন্তু মানবসভ্যতা নিজের প্রয়োজনের তাগিদে নদীর উদ্দাম, বাঁধনহারা গতিকে রোধ করে তার বুকের ওপর সুবিশাল কংক্রিটের সাঁকো বা ব্রিজ তৈরি করে নদীকে বন্দি করেছে। গত পাঁচ দিনের অবিশ্রান্ত বর্ষণে ফুলে-ফেঁপে ওঠা উন্মত্ত নদী যখন আক্রোশে সেই ব্রিজ ভেঙে ফেলতে উদ্যত হয়েছিল, তখন ব্রিজের বিপন্ন অস্তিত্বের কথা ভেবে নদেরচাঁদ কষ্ট পায়। নদীর প্রতি গভীর অনুরাগ সত্ত্বেও মানুষের বুদ্ধি ও শ্রম দিয়ে গড়া এই সুদৃঢ় সেতুটির আসন্ন ধ্বংসের আশঙ্কায় নদেরচাঁদ ব্রিজের প্রতি একধরনের ক্ষণস্থায়ী মায়া ও মমতা অনুভব করেছিল।
৩.২ যে-কোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও: [১ × ৩ = ৩]
৩.২.১ “হাসিবে মেঘবাহন”, – ‘মেঘবাহন’ কে? তিনি হাসবেন কেন? [১+২]
উত্তর:
‘মেঘবাহন’-এর পরিচয়:
পৌরাণিক অনুষঙ্গে মেঘ যাঁকে বহন করে, অর্থাৎ দেবরাজ ইন্দ্র-কে এখানে ‘মেঘবাহন’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
উৎস: মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত ‘মেঘনাদবধ কাব্য’-এর প্রথম সর্গ থেকে সংকলিত ‘অভিষেক’ শীর্ষক কাব্যাংশ।
মেঘবাহনের হাসির কারণ:
লঙ্কাধিপতি রাবণের প্রিয় পুত্র বীরবাহুর মৃত্যুর পর রাক্ষসরাজ যখন স্বয়ং যুদ্ধযাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন ইন্দ্রজিৎ প্রমোদোদ্যানে নারী পরিবেষ্টিত হয়ে বিলাসে মগ্ন ছিলেন। একদা ইন্দ্রজিৎ স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্রকে যুদ্ধে পরাস্ত করে বন্দি করেছিলেন এবং সেই গ্লানি ইন্দ্র কোনোদিন ভুলতে পারেননি। এখন স্বর্ণলঙ্কার এমন ঘোর বিপদের দিনে বীরচূড়ামণি মেঘনাদ যদি রাজপ্রাসাদে না গিয়ে বিলাসব্যসনে মত্ত থাকেন এবং তাঁর বৃদ্ধ পিতা যুদ্ধে অবতীর্ণ হন, তবে দেবরাজ ইন্দ্র শত্রু হিসেবে মেঘনাদের এই পৌরুষহীনতা ও দায়িত্বজ্ঞানহীন বিলাসিতা দেখে উপহাস করবেন। শত্রুর সেই বিদ্রূপ ও আত্মসম্মানের হানি এড়াতেই ইন্দ্রজিৎ আশঙ্কা করেছিলেন যে মেঘবাহন হাসবেন।
৩.২.২ “আসছে নবীন- জীবনহারা অ-সুন্দরে করতে ছেদন।”- উদ্ধৃতিটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো। [৩]
উত্তর:
উৎস: বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত কালজয়ী কবিতা ‘প্রলয়োল্লাস’।
তাৎপর্য বিশ্লেষণ:
-
পুরাতনের বিনাশ ও নূতনের আবাহন: উদ্ধৃত পঙ্ক্তিটিতে প্রলয়ঙ্কর ধ্বংসের আড়ালে সুন্দরের নবজাগরণের শাশ্বত সত্য ফুটে উঠেছে। ‘নবীন’ বলতে কবি দেশের তরুণ ও নির্ভীক বিপ্লবী শক্তিকে বুঝিয়েছেন, যারা পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে বদ্ধপরিকর।
-
‘অ-সুন্দর’-এর অর্থ: ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, সামাজিক কুসংস্কার, অন্ধ স্থবিরতা এবং দাসত্বকে কবি ‘জীবনহারা অ-সুন্দর’ বলে চিহ্নিত করেছেন। যা প্রাণহীন, গতিহীন এবং মনুষ্যত্বকে শৃঙ্খলিত করে রাখে, তা-ই অ-সুন্দর।
-
ছেদনের রূপক: মহাকালের রুদ্ররূপে সজ্জিত হয়ে কালভৈরবের ন্যায় তরুণ বিপ্লবীরা সেই সমস্ত জড়তা, অন্যায্য শোষণ ও পরাধীনতার প্রতীককে তরবারির এক আঘাতে ছেদন বা বিনষ্ট করতে এগিয়ে আসছে। ধ্বংস কোনো অশুভ পরিণতি নয়; বরং এক নবীন, মুক্ত ও সাম্যবাদী সমাজ গঠনের পূর্বশর্ত হলো এই প্রাণবন্ত বিপ্লব।
৪. কম-বেশি ১৫০ শব্দে যে-কোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও: [১ × ৫ = ৫]
৪.১ “তার চেয়ে দুঃখের কিছু নেই, তার থেকে অপমানের!”- কার এমন দুঃখ-অপমান বোধ হয়েছিল? তার এমন মনে হওয়ার কারণ কী? [১+৪]
উত্তর:
ব্যক্তির পরিচয়:
উদ্ধৃত অংশে কিশোর লেখক তপনের মনে এমন গভীর মর্মবেদনা ও তীব্র অপমানবোধের সৃষ্টি হয়েছিল।
উৎস: প্রখ্যাত কথাশিল্পী আশাপূর্ণা দেবী রচিত ছোটোগল্প ‘জ্ঞানচক্ষু’।
দুঃখ ও অপমান বোধের কারণ:
তপনের মনে এই তীব্র ক্ষোভ ও যন্ত্রণাদায়ক আত্মগ্লানি গড়ে ওঠার পেছনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট মনস্তাত্ত্বিক কারণ সক্রিয় ছিল:
-
মৌলিক সৃষ্টির স্বপ্নভঙ্গ: ছোটোমাসির বিয়ের পর লেখক ছোটোমেসোকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে তপন একটি সম্পূর্ণ মৌলিক গল্প রচনা করেছিল। মেসোমশাই গল্পটির ভূয়সী প্রশংসা করে তা ‘সন্ধ্যাতারা’ পত্রিকায় ছাপিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তপন পরম উদ্দীপনায় ভেবেছিল সে একজন সত্যিকারের লেখক হিসেবে স্বীকৃতি পেতে চলেছে।
-
মেসোর ‘কারেকশন’ ও আত্মমর্যাদায় আঘাত: পত্রিকা প্রকাশের পর দেখা যায় মেসোমশাই গল্পটি ‘একটু-আধটু কারেকশন’ করার নামে কার্যত আদি থেকে অন্ত সম্পূর্ণ নতুন করে নিজের ভাষায় লিখে দিয়েছেন। বাড়ির বড়োরা তপনের প্রতিভার পরিবর্তে নতুন মেসোর মহত্ত্ব ও উদারতারই জয়গান গাইতে থাকে। তপনের নিজের মৌলিক সৃষ্টি মেসোর করুণার আড়ালে সম্পূর্ণ ম্লান হয়ে যায়।
-
মায়ের নির্দেশ ও চরম সত্যের মুখোমুখি: মা যখন তপনকে নিজের লেখা গল্পটি বাড়ির সকলের সামনে উচ্চৈঃস্বরে পাঠ করতে বলেন, তখন প্রতিটি লাইন পড়তে গিয়ে তপন চরম অস্বস্তিতে পড়ে। সে বুঝতে পারে, ছাপার অক্ষরে যা প্রকাশিত হয়েছে তা সম্পূর্ণভাবে মেসোরই রচনা; তাতে তপনের নিজের কোনো ভাষা, অনুভূতি বা মৌলিক চিন্তার লেশমাত্র নেই।
-
আত্মপ্রবঞ্চনার গ্লানি: নিজের নামে অন্যের লেখা গল্প পড়ার যে লজ্জা ও ভণ্ডামি, তা এক সংবেদনশীল কিশোরের আত্মসম্মানকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়। অন্যের কৃতিত্ব নিজের বলে চালিয়ে দেওয়ার এই নীরব প্রতারণা তপনকে এক দুঃসহ আত্মপীড়নের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
এই মিথ্যা প্রশংসার আড়ালে নিজের সৃষ্টির মৃত্যু দেখে তপন মনে করেছিল— নিজের লেখা কাঁচা হোক বা অপটু, তা নিজ শক্তিতে প্রকাশিত হওয়াই গৌরবের; অন্যের করুণায় নাম কেনার চেয়ে বড়ো দুঃখ ও অপমান পৃথিবীতে আর কিছু হতে পারে না।
৪.২ “এই জানোয়ারটাকে ওয়াচ করবার দরকার নেই।”- ‘জানোয়ারটা’ বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে? তাকে ‘ওয়াচ’ করবার দরকার নেই কেন লেখো। [১+৪]
উত্তর:
উদ্দিষ্ট চরিত্রের পরিচয়:
উদ্ধৃত সংলাপে ব্রিটিশ পুলিশের বড়োকর্তা নিমাইবাবু আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ ও রোগগ্রস্ত বেশধারী গিরীশ মহাপাত্রকে (ছদ্মবেশী দেশপ্রেমিক বিপ্লবী সব্যসাচী মল্লিক) ব্যঙ্গার্থে ‘জানোয়ার’ বলে উল্লেখ করেছেন।
উৎস: কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত রাজনৈতিক উপন্যাস ‘পথের দাবী’ (অংশবিশেষ)।
‘ওয়াচ’ না করার কারণ:
নিমাইবাবু গিরীশ মহাপাত্রকে নজরদারির বাইরে রাখার নির্দেশ দেওয়ার পেছনে মূলত গিরীশের অদ্ভুত শারীরিক অবস্থা, বেশভূষা এবং তাঁর সামগ্রিক আপাত-অসংলগ্ন আচরণ প্রধান ভূমিকা নিয়েছিল:
-
রোগগ্রস্ত ও জীর্ণ শারীরিক অবস্থা: গিরীশ মহাপাত্রের বয়স ত্রিশ-বত্রিশের বেশি না হলেও তার শরীর ছিল মারাত্মক রোগপীড়িত ও শীর্ণ। তার ফ্যাকাশে মুখ, সর্বাঙ্গ কাঁপিয়ে ওঠা অবিশ্রান্ত শুকনো কাশি এবং দম আটকানো শ্বাসকষ্ট দেখে পুলিশের অভিজ্ঞ চোখে মনে হয়েছিল যে সে চরম ক্ষয়রোগ বা রাজযক্ষ্মায় আক্রান্ত, যার আয়ু আর বড়োজোর কয়েকটা দিন মাত্র। এমন ভগ্নস্বাস্থ্যের মানুষ কোনো সশস্ত্র গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠনের নেতৃত্ব দিতে পারে— তা ভাবাই পুলিশের কাছে অসম্ভব মনে হয়েছিল।
-
অদ্ভুত ও হাস্যকর বেশভূষা: গিরীশের পোশাক-পরিচ্ছদ ছিল রুচিহীন ও কিম্ভূতকিমাকার। মাথায় সুবিন্যস্ত তৈলাক্ত লম্বা চুল এবং গভীর সিঁথি, গায়ে জাপানি সিল্কের রামধনু রঙের পাঞ্জাবি, পরনে বিলেতি মিলের কালো পাড়ের ধুতি এবং পায়ে সবুজ রঙের জরিদার মোজা ও বার্নিশ করা পাম্পশু— সব মিলিয়ে তাকে এক ভাঁড় বা সং-এর মতো দেখাচ্ছিল। কোনো আদর্শবাদী ও আত্মগোপনকারী বিপ্লবীর পক্ষে এমন দৃষ্টিকটু সাজ অসম্ভব বলে ব্রিটিশ পুলিশ ধরে নিয়েছিল।
-
পকেট ও ট্যাঁকের বিভ্রান্তিকর জিনিসপত্র: তার জামাকাপড় ও ট্যাঁক তল্লাশি করে কোনো রাজনৈতিক প্রচারপত্র বা বিপজ্জনক অস্ত্রশস্ত্র মেলেনি। পাওয়া গিয়েছিল কেবল বিড়ি, দেশলাই, একটি কাঠের হাতলওয়ালা ভাঙা কম্পাস, ফুটরুল এবং একটি গাঁজার কলকে। যদিও সে দাবি করে গাঁজা খায় না, বরং পথে কুড়িয়ে পেয়ে রেখে দিয়েছে।
-
অতি-ভদ্র ও ভিতু আচরণ: পুলিশের জেরার মুখে সে অত্যন্ত বিনীত, করুণ ও ভয়ার্ত ভঙ্গিতে নিজেকে এক নিতান্ত নিরপরাধ ‘ধর্মভীরু মানুষ’ হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা চালায়।
গিরীশের এই চূড়ান্ত জড়তা, ভীতি এবং নির্বোধের মতো আচরণ দেখে নিমাইবাবু নিশ্চিত হন যে, এমন রোগজীর্ণ ও মূর্খ ব্যক্তি কখনোই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ত্রাস সুশিক্ষিত ডাক্তার সব্যসাচী মল্লিক হতে পারে না। তাই অযথা সময় নষ্ট না করে এই আপাত-অর্থহীন ‘জানোয়ার’ সদৃশ মানুষটিকে নজরদারির বাইরে রাখার নির্দেশ দেন।
৫. কম-বেশি ১৫০ শব্দে যে-কোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও: [১ × ৫ = ৫]
৫.১ “অস্ত্র ফ্যালো, অস্ত্র রাখো পায়ে”- কবি অস্ত্র ফেলতে বলেছেন কেন? অস্ত্র পায়ে রাখার তাৎপর্য কী? [২+৩]
উত্তর:
উৎস: আধুনিক বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট কবি জয় গোস্বামী রচিত ‘পাতাগুলির গান’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ‘অস্ত্রের বিরুদ্ধে গান’ কবিতা।
অস্ত্র ফেলতে বলার কারণ:
কবি জয় গোস্বামী যুদ্ধবাজ ও আগ্রাসী আধুনিক সভ্যতার রক্তক্ষয়ী হিংসা, হানাহানি এবং পারস্পরিক বিদ্বেষের বিরুদ্ধে মানবতার অমোঘ বার্তা পৌঁছে দিতে অস্ত্র ত্যাগ করার আহ্বান জানিয়েছেন। আধুনিককালে ক্ষমতাদর্পী মানুষ অস্ত্র ও সামরিক শক্তির অহংকারে অন্ধ হয়ে নিরীহ মানুষের রক্তে ধরিত্রীকে কলুষিত করছে। রক্তপাতের এই অন্তহীন উন্মাদনা মানবজাতির অস্তিত্বকেই ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। কবি বিশ্বাস করেন, হিংসার জবাব হিংসা বা অস্ত্রের প্রত্যুত্তর অস্ত্রের আঘাতে হতে পারে না; বরং গান, ভালোবাসা ও শুভবোধের মাধ্যমেই এই উন্মত্ত রক্তপাত প্রতিহত করা সম্ভব। তাই তিনি অবিলম্বে রণোন্মাদনা পরিহার করে সমস্ত মারণাস্ত্র বর্জনের নির্দেশ দিয়েছেন।
অস্ত্র পায়ে রাখার তাৎপর্য:
অস্ত্র পায়ে রাখার অভিব্যক্তির মধ্য দিয়ে কবি এক গভীর মানবিক ও প্রতীকি তাৎপর্য তুলে ধরেছেন:
-
অহংকার ও আসুরিক শক্তির আত্মসমর্পণ: পদতলে অস্ত্র সমর্পণ করা হলো হিংস্র দাম্ভিকতা এবং আগ্রাসী যুদ্ধলিপ্সার বিনম্র পরাজয় স্বীকার। শক্তির অপপ্রয়োগকে সংযত করে হৃদয়ের শুভচেতনা ও মানবতার পদপ্রান্তে নতজানু করাই এর উদ্দেশ্য।
-
শিল্প ও সুরের সার্বভৌমিকতা প্রতিষ্ঠা: কবি অস্ত্রকে গানের চরণে, অর্থাৎ সুর ও ভালোবাসার পবিত্র সান্নিধ্যে সমর্পণ করতে বলেছেন। সংঘাতের পথ পরিহার করে মানুষ যখন শিল্পের আশ্রয় গ্রহণ করবে, তখন হিংস্র রক্তপিপাসা স্তব্ধ হয়ে প্রেম ও সহমর্মিতার বিকাশ ঘটবে।
-
শাশ্বত শান্তির আবাহন: অস্ত্র হাতে থাকলে সংঘাত অনিবার্য, কিন্তু তা পদতলে নিক্ষিপ্ত হলে রক্তপাতের সমাপ্তি ঘটে। পদতলে অস্ত্র রেখে মানুষ কেবল খালি হাতে দাঁড়াবে না, বরং তার সেই হাত দুটি অন্য মানুষের কল্যাণস্পর্শে ও আলিঙ্গনে প্রসারিত হবে।
সংক্ষেপে, অস্ত্র পায়ে রাখা হলো যুদ্ধবাজ মানসিকতার সম্পূর্ণ বিলুপ্তি ঘটিয়ে শাশ্বত প্রেম, সাম্য ও শান্তির চিরন্তন জয়গান ঘোষণা করা।
৫.২ “সে জানত না আমি আর কখনো ফিরে আসব না।”— বক্তা কে? ‘সে’ বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে? বক্তার ফিরে না আসার কারণ কী? [১+১+৩]
উত্তর:
উৎস: চিলিয়ান কবি পাবলো নেরুদা রচিত এবং বিশিষ্ট ভারতীয় কবি নবারুণ ভট্টাচার্য অনূদিত কবিতা ‘অসুখী একজন’।
বক্তার পরিচয়:
উদ্ধৃত পঙ্ক্তিটির বক্তা হলেন চিলিয়ান নোবেলজয়ী কবি পাবলো নেরুদা স্বয়ং (অনুবাদে কবিতাটির কথক বা স্বঘোষিত যোদ্ধা)।
‘সে’-এর পরিচয়:
উদ্ধৃতিটিতে ‘সে’ বলতে কথকের ফেলে আসা দেশের বাড়ির দরজায় তাঁর ফিরে আসার প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা অনন্যা, ভালোবাসার প্রতীকরূপী এক তরুণী (বা কবির প্রেয়সী)-কে বোঝানো হয়েছে।
বক্তার ফিরে না আসার কারণ:
বক্তার আর কোনোদিন ফিরে না আসার পেছনে ছিল সর্বগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ এবং রক্তক্ষয়ী রাজনৈতিক বাস্তবতার নির্মম অভিঘাত:
-
যুদ্ধের অতল গহ্বরে আত্মনিবেদন: দেশ, সমাজ ও মানবমুক্তির বৃহত্তর সংগ্রামে অংশ নিতে কথক নিজের গৃহকোণ ও ব্যক্তিগত ভালোবাসার মায়াজাল ছিন্ন করে দূর দেশে পাড়ি দিয়েছিলেন। এই জাতীয়তাবাদী ও রাজনৈতিক লড়াই ছিল একমুখী— যেখানে ফিরে আসার চেয়ে আত্মত্যাগের সম্ভাবনাই ছিল নিশ্চিত।
-
আগ্নেয় পাহাড়ের মতো সর্বগ্রাসী ধ্বংসযজ্ঞ: কথকের প্রস্থানের পর সেই শান্ত সমতল ভূমিতে নেমে আসে নিষ্ঠুর যুদ্ধ। আগ্নেয় পাহাড়ের মতো লাভার স্রোতে রক্তাক্ত হয়ে ওঠে জনপদ। বোমাবর্ষণ ও সামরিক হামলায় প্রাচীন শান্ত দেবালয়ের মূর্তিসমূহ চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় এবং সাধারণ নিরীহ শিশুরা পর্যন্ত গণহত্যার শিকার হয়।
-
স্মৃতির আলয় ও পথচিহ্নের বিলুপ্তি: যুদ্ধের লেলিহান দাবানলে কথকের ভালোবাসার মিষ্টি বাড়িটি, ঝুলন্ত বারান্দা, চিমনি এবং গোলাপগাছসহ প্রতিটি গৃহস্থালি নিদর্শন ভস্মীভূত হয়ে যায়। যে পথে কথক হেঁটে গিয়েছিলেন, সেখানে ঘাস গজিয়ে এবং রক্তের কালো দাগ পড়ে সমস্ত স্মৃতি ও প্রত্যাবর্তনের পথচিহ্ন চিরতরে মুছে যায়।
যুদ্ধের বিধ্বংসী প্রলয়ে কথকের পরিচিত জগৎ ও মানববসতি সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। মৃত্যুর মিছিল পেরিয়ে ফেলে আসা অতীতে ফিরে আসার সমস্ত বাস্তব সম্ভাবনা ও সাঁকো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় বক্তা আর কখনো ঘরে ফিরতে পারেননি।
৬. কম-বেশি ১৫০ শব্দে যে-কোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও: [১ × ৫ = ৫]
৬.১ “আশ্চর্য, সবই আজ অবলুপ্তির পথে।” – কোন্ জিনিস অবলুপ্তির পথে? কীভাবে জিনিসটি অবলুপ্তির পথে গেল আলোচনা করো। [১+৪]
উত্তর:
উৎস: নিখিল সরকার (ছদ্মনাম ‘শ্রীপান্থ’) রচিত আত্মজৈবনিক রম্য-প্রবন্ধ ‘হারিয়ে যাওয়া কালি কলম’।
অবলুপ্তির পথে এগিয়ে যাওয়া জিনিস:
প্রাবন্ধিক শ্রীপান্থের স্মৃতিমেদুর ভাবনায় ঐতিহ্যবাহী লেখার সামগ্রী— বিশেষ করে কালি, কলম ও দোয়াত (প্রাচীন নলখাগড়া, পাখির পালক, বাঁশের কঞ্চির কলম থেকে শুরু করে ধাতব নিব ও ফাউন্টেন পেন)-এর বিচিত্র সম্ভার আজ সম্পূর্ণ অবলুপ্তির পথে।
অবলুপ্তির কারণসমূহ:
ঐতিহ্যমণ্ডিত লেখার মাধ্যমগুলির হারিয়ে যাওয়ার পেছনে সামাজিক ও প্রযুক্তিগত বিবর্তন বিশেষভাবে কাজ করেছে:
-
কম্পিউটার ও টাইপরাইটারের যান্ত্রিক আধিপত্য: প্রাবন্ধিক নিজেই তাঁর কর্মক্ষেত্র সংবাদপত্রের দপ্তরে প্রত্যক্ষ করেছেন যে, একদা যেখানে টেবিলভর্তি লেখালিখি চলত দোয়াত আর কলমের খসখস শব্দে, সেখানে আজ প্রত্যেকের সামনে স্থান করে নিয়েছে নিঃশব্দ কম্পিউটার। কম্পিউটার আসার ফলে হস্তাক্ষরের শিল্পময় নান্দনিক চর্চাটাই হারিয়ে গেছে।
-
সহজলভ্য ডট পেন বা বলপেনের আগ্রাসন: হস্তশিল্পজাত বিভিন্ন দেশি-বিদেশি বহুমূল্য ফাউন্টেন পেন এবং দোয়াতের স্থান দখল করেছে অত্যন্ত সস্তা, সহজে বহনযোগ্য ও একবার ব্যবহার করে ফেলে দেওয়ার মতো আধুনিক ‘বলপেন’ বা ডট পেন। এর ফলে কালি তৈরি, নিব পালটানো বা দোয়াত পরিষ্কার রাখার শ্রমসাধ্য অভ্যাস সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে চিরতরে মুছে গেছে।
-
দৈনন্দিন জীবনের গতি ও ব্যস্ততা: আধুনিক জীবনের দ্রুততা ও কর্মব্যস্ততার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে মানুষ প্রাচীন ধৈর্যশীল ও সুকুমার প্রথাগুলো বিসর্জন দিয়েছে। খাগের কলম, পাখির পালকের ‘কুইল’ কিংবা কাচের দোয়াতের তরল কালি সামলানোর অবকাশ এখন আর কারও নেই।
-
সৃজনশীল লেখার সংবেদনশীলতার অবক্ষয়: লেখক উল্লেখ করেছেন যে প্রাচীনকালে কালি তৈরি ছিল একটি রীতিমতো শিল্প ও পারিবারিক ঐতিহ্য। মাটির উনুনে কড়াইয়ের তলার ঝুল কালি বা হরীতকী-তিল মিশিয়ে কালি বানানোর পারিবারিক ও সামাজিক চর্চা যান্ত্রিক অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বিলীন হয়ে গেছে।
যন্ত্রের যান্ত্রিক আগ্রাসন ও সভ্যতার তথাকথিত গতির চাপে মানুষের মনের আবেগমাখা প্রাচীন লেখার সংস্কৃতি বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেছে।
৬.২ “আমাদের আলংকারিকগণ শব্দের ত্রিবিধ কথা বলেছেন।” ‘ত্রিবিধ’ কথা কী কী? তাদের প্রয়োগমূলক দিকগুলি সম্পর্কে আলোচনা করো। [১+৪]
উত্তর:
উৎস: বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও বিজ্ঞান-লেখক রাজশেখর বসু (পরশুরাম) রচিত জ্ঞানগর্ভ প্রবন্ধ ‘বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান’।
শব্দের ‘ত্রিবিধ’ রূপ:
প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃত অলংকারশাস্ত্র অনুযায়ী শব্দের ত্রিবিধ রূপ বা শক্তি হলো:
১. অভিধা (বাচ্যার্থ)
২. লক্ষণা (লক্ষ্যার্থ)
৩. ব্যঞ্জনা (ব্যঙ্গার্থ)।
প্রয়োগমূলক দিকের আলোচনা:
সাহিত্যে ও বিজ্ঞানের রচনায় শব্দের এই তিন শক্তির প্রয়োগপদ্ধতি সম্পূর্ণ ভিন্ন চরিত্রের:
-
অভিধার প্রয়োগ (বিজ্ঞানের সাহিত্যের একমাত্র মাধ্যম):
-
অর্থ: কোনো শব্দের প্রথম ও প্রত্যক্ষ আভিধানিক বা ব্যবহারিক অর্থকে বলা হয় ‘অভিধা’।
-
প্রয়োগ: বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধে ব্যবহৃত শব্দের অর্থ হতে হবে সম্পূর্ণ স্পষ্ট, সংশয়হীন ও সুনির্দিষ্ট। এখানে শব্দকে তার প্রাথমিক বা আভিধানিক অর্থেই গ্রহণ করতে হয়, যাতে কোনো অর্থবিভ্রান্তি না ঘটে। যেমন— বিজ্ঞানে ‘জল’ বা ‘H₂O’ বললে কেবল নির্দিষ্ট রাসায়নিক তরল পদার্থটিকেই বোঝায়। বিজ্ঞান রচনায় অভিধাই হলো প্রধান ও গ্রহণযোগ্য শক্তি।
-
-
লক্ষণার প্রয়োগ (সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য):
-
অর্থ: যখন কোনো শব্দের প্রচলিত আভিধানিক অর্থ সম্পূর্ণ কার্যকর না হয়ে সেই অর্থের সঙ্গে যুক্ত কোনো গৌণ বা সংশ্লিষ্ট সাদৃশ্যপূর্ণ অর্থ প্রকাশ পায়, তাকে ‘লক্ষণা’ বলে।
-
প্রয়োগ: যেমন— “অরণ্যে রোদন”। এর আভিধানিক অর্থ অরণ্যে বসে কান্না করা হলেও লক্ষণার মাধ্যমে এর প্রচলিত প্রকৃত অর্থ দাঁড়ায় “বৃথা আবেদন”। সাধারণ সাহিত্যে লক্ষণা উপযোগী হলেও বিজ্ঞানের তথ্যনির্ভর লেখায় এর অসাবধানী ব্যবহার পাঠককে বিভ্রান্ত করতে পারে।
-
-
ব্যঞ্জনার প্রয়োগ (কাব্যকলার গভীরতা):
-
অর্থ: অভিধা বা লক্ষণা দিয়ে যে গভীর, ভাবময় ও ব্যঞ্জনাময় অন্তর্নিহিত অর্থ প্রকাশিত হয় না, শব্দের যে অন্তর্লীন শক্তি পাঠককে এক বিশেষ রূপক বা প্রতীকি অনুভূতির স্তরে নিয়ে যায়, তা-ই হলো ‘ব্যঞ্জনা’।
-
প্রয়োগ: যেমন— “দেশের লজ্জা”। এখানে কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত লজ্জা বোঝায় না, ব্যঞ্জনার মাধ্যমে পুরো জাতির সামগ্রিক অবক্ষয়কে দ্যোতিত করে। কাব্য ও নাটকে ব্যঞ্জনা অপরিহার্য সম্পদ হলেও বৈজ্ঞানিক সাহিত্যের যুক্তিগ্রাহ্য ও তথ্যভিত্তিক আলোচনার ক্ষেত্রে ব্যঞ্জনার প্রয়োগ যতটা সম্ভব পরিহার করাই শ্রেয়।
-
অতএব, প্রাবন্ধিকের অভিমত অনুযায়ী সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে লক্ষণা ও ব্যঞ্জনা প্রধান হাতিয়ার হলেও যথার্থ বিজ্ঞানচর্চায় কেবলমাত্র ‘অভিধা’-র ওপর নির্ভর করাই বিধেয়।
৭. কম-বেশি ১২৫ শব্দে যে-কোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও: [১ × ৪ = ৪]
৭.১ “তোমাকে আমরা তোপের মুখে উড়িয়ে দিতে পারি,” কাকে উদ্দেশ করে বলা? বক্তার এমন বলার কারণ কী? [১+৩]
উত্তর:
উৎস: প্রখ্যাত নাট্যকার শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত রচিত ঐতিহাসিক নাটক ‘সিরাজদ্দৌলা’।
উদ্দিষ্ট ব্যক্তি:
উদ্ধৃত অংশে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদ্দৌলা ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ধূর্ত ও উদ্ধত প্রতিনিধি মঁসিয়ে জাঁ দ্য লা ভঁলফেঁাঁ ওয়াটস-কে উদ্দেশ্য করে এই সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন।
উৎস: প্রখ্যাত নাট্যকার শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত রচিত ঐতিহাসিক নাটক ‘সিরাজদ্দৌলা’।
বক্তার এমন বলার কারণ:
নবাবের দরবারে উপস্থিত রাজদূত ওয়াটসের বিরুদ্ধে সরাসরি দেশদ্রোহিতা, বিশ্বাসভঙ্গ ও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অকাট্য প্রমাণ মেলার কারণেই নবাব এই চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন:
-
কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন: ওয়াটস কোম্পানীর দূত হিসেবে মুর্শিদাবাদ দরবারে অবস্থান করে নবাবের সার্বভৌম ক্ষমতার অধীনে নিরাপত্তা পাচ্ছিলেন। কিন্তু তিনি রাজদূতের যাবতীয় সম্মান ও আন্তর্জাতিক শিষ্টাচার পদদলিত করে নবাববিরোধী চক্রান্তের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন।
-
মিরজাফরের সঙ্গে গোপন চুক্তি: নবাবের হস্তগত হওয়া গোপন চিঠিপত্র মারফত ফাঁস হয়ে যায় যে, ওয়াটস গোপনে প্রধান সেনাপতি মিরজাফর এবং অন্যান্য অসন্তুষ্ট রাজকর্মচারীদের সঙ্গে নবাবকে সিংহাসনচ্যুত করার কুৎসিত চুক্তিপত্র স্বাক্ষর করেছেন।
-
কলকাতা আক্রমণের প্ররোচনা: শুধু অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রই নয়, অ্যাডমিরাল ওয়াটসন ও লর্ড ক্লাইভকে বাংলায় সেনা সমাবেশ করতে এবং রাজধানী মুর্শিদাবাদ আক্রমণের উসকানি দিয়ে ওয়াটস চিঠি লিখেছিলেন।
কোনো দেশের রাজদূত যখন স্বাগতিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই প্রত্যক্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতায় লিপ্ত হন, তখন যুদ্ধনীতির কঠোর বিধান অনুযায়ী তিনি প্রাণদণ্ডযোগ্য অপরাধী হিসেবে গণ্য হন। ওয়াটসের এই ক্ষমার অযোগ্য বিশ্বাসঘাতকতা উন্মোচিত হওয়ার পরই ক্ষুব্ধ নবাব জানিয়েছিলেন যে, এই চরম ধৃষ্টতার কারণে তাকে তোপের মুখে উড়িয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ ন্যায়সঙ্গত।
৭.২ “জাতির সৌভাগ্য সূর্য আজ অস্তাচলগামী”- বক্তা কে? উক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো। [১+৩]
উত্তর:
উৎস: নাট্যকার শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত রচিত একাঙ্ক ঐতিহাসিক নাটক ‘সিরাজদ্দৌলা’।
বক্তার পরিচয়:
উদ্ধৃত গভীর মর্মস্পর্শী উক্তিটির বক্তা হলেন বাংলার দেশপ্রেমিক তরুণ নবাব সিরাজদ্দৌলা।
উক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ:
পলাশীর আসন্ন যুদ্ধের প্রাক্কালে দেশীয় ক্ষমতালোভী অমাত্যদের বিশ্বাসঘাতকতা এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসনে সমগ্র বাংলা তথা ভারতের স্বাধীনতার ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে ওঠার আশঙ্কায় নবাব এই রূপকধর্মী মন্তব্যটি করেছেন:
-
অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতা ও আত্মঘাতী গৃহবিবাদ: নবাবের নিজস্ব দরবারের প্রধান সেনাপতি মিরজাফর, জগৎশেঠ, রাজবল্লভ, রায়দুর্লভ এবং উমিচাঁদের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিরা বিদেশি বণিকদের প্ররোচনায় স্বদেশের সার্বভৌমত্ব বিক্রি করে দিতে উদ্যত হয়েছিলেন। তাঁদের এই আত্মঘাতী গৃহশত্রুতার ফলে নবাবের শক্তি ভেতর থেকেই ভেঙে পড়েছিল।
-
পলাশীর প্রান্তরে আসন্ন বিপর্যয়: ইংরেজদের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষামূলক চূড়ান্ত যুদ্ধ আসন্ন জেনেও সেনাপতিরা দরবারে নির্লজ্জভাবে অসহযোগিতা প্রদর্শন করছিলেন। নবাব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলেন যে তাঁদের এই ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও অন্ধ স্বার্থপরতার বলি হতে চলেছে পুরো দেশ।
-
পরাধীনতার অন্ধকার পদধ্বনি: সিরাজদ্দৌলা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন যে পলাশীর প্রান্তরে যদি নবাবের পরাজয় ঘটে, তবে তা কেবল একজন শাসকের পতন হবে না; বরং সমস্ত ভারতবাসীর ওপর নেমে আসবে দীর্ঘস্থায়ী ঔপনিবেশিক দাসত্ব ও বঞ্চনার ঘন কালো অন্ধকার।
সূর্য অস্ত গেলে যেমন চরাচর তমসায় নিমজ্জিত হয়, তেমনি গৃহশত্রুদের চরম বেইমানির দরুন স্বাধীন বাংলার জাতীয় মুক্তি ও আত্মমর্যাদার সূর্য চিরতরে অস্তমিত হতে বসেছে— নবাবের এই খেদোক্তির মধ্য দিয়ে চরম অসহায়তা এবং গভীর ট্র্যাজেডির আবহ ফুটে উঠেছে।
৮. কম-বেশি ১৫০ শব্দে যে-কোনো দুটি প্রশ্নের উত্তর দাও: [২ × ৫ = ১০]
৮.১ “এটা বুকের মধ্যে পুষে রাখুক।” – ‘এটা’ কী? কী ভাবে, কার মধ্যে এটা তৈরি হয়েছিল? [১+৪]
উত্তর:
‘এটা’-র অর্থ:
উদ্ধৃত অংশে ‘এটা’ বলতে জুপিটার ক্লাবের সুইমিং পুলে বঞ্চনা ও কুৎসিত ক্লাব-রাজনীতির শিকার হয়ে তৈরি হওয়া তীব্র অপমানবোধ, দ্রোহ এবং সেই অপমানের যোগ্য প্রত্যুত্তর দেওয়ার অদম্য প্রতিশোধস্পৃহা ও জেদ-কে বোঝানো হয়েছে।
উৎস: প্রখ্যাত কথাশিল্পী মতি নন্দী রচিত জনপ্রিয় উপন্যাস ‘কোনি’।
কোথায় ও কীভাবে এই মানসিকতা তৈরি হয়েছিল:
এই তীব্র আক্রোশ ও জেদ তৈরি হয়েছিল দারিদ্র্যপীড়িত, লড়াকু সাঁতারু কোনি (কনকচাঁপা পাল)-র হৃদয়ে। এর পটভূমি গড়ে ওঠার বিবরণটি নিম্নরূপ:
-
জুপিটারে সুযোগ ও শর্ত: ক্ষিতীশ সিংহ কোনিকে জুপিটার ক্লাবের মূল পুলে সাঁতার অনুশীলনের সুযোগ করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ক্লাবের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। শেষ পর্যন্ত এই শর্তে রাজি করানো হয় যে, কোনি কেবল ভোরে সাধারণ ঘণ্টার আগে অন্যদের সঙ্গে পুলের এক প্রান্তে নিঃশব্দে সামান্য সাঁতার কাটতে পারবে।
-
হিয়া ও অমিয়াদের হিংসা এবং অপমান: কোনির জন্মগত শারীরিক গঠন, অসাধারণ দম এবং সাঁতারের বিস্ময়কর গতি দেখে ক্লাবের প্রধান নারী সাঁতারু অমিয়া ও হিয়া মিত্রের মনে তীব্র ঈর্ষার সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে অমিয়া কোনো বস্তিবাসী, অপটু সাধারণ মেয়েকে নিজের পাশে জলে সাঁতার কাটতে দেখে ক্ষুব্ধ ও অপমানিত বোধ করে।
-
জলে নামতে বাধা ও বঞ্চনা: একদিন সকালে কোনি ক্লাবের পুলে সাঁতার কাটার জন্য প্রস্তুত হয়ে জলে নামতে গেলে ক্লাবের কর্তাব্যক্তিরা এবং ট্রেনাররা অত্যন্ত রূঢ় ও অপমানজনকভাবে তাকে বাধা দেন। তাকে তাড়িয়ে দিয়ে বলা হয় যে বড়ো ঘরের মেয়েরা সাঁতার কাটার সময়ে তার মতো নোংরা বস্তির মেয়ের সেখানে নামার কোনো অধিকার নেই।
-
অপমানের আঘাত ও ক্ষিতীশের দিকনির্দেশ: অশ্রুসজল চোখে জল থেকে উঠে আসা কোনি ক্ষোভে-অপমানে থরথর করে কাঁপতে থাকে। ক্ষিতীশ সিংহ কোনির চোখের সেই অবদমিত অশ্রু ও জ্বলন্ত ক্রোধ লক্ষ্য করেন। তিনি কোনিকে সান্ত্বনা না দিয়ে উলটে সেই ক্ষোভকে স্থায়ী শক্তিতে পরিণত করার নির্দেশ দেন।
ক্ষিতীশ চেয়েছিলেন কোনি যেন এই অবমাননা ভুলে না যায়; বরং একে হৃদয়ের গভীরে আগুনের মতো জ্বালিয়ে রাখে, যাতে এই তীব্র ক্ষোভ তাকে একদিন জলে অমিয়া ও হিয়াদের হারিয়ে শ্রেষ্ঠত্ব ছিনিয়ে নেওয়ার সর্বোচ্চ অনুপ্রেরণা জোগায়।
৮.২ “তবে আপনার হার্টটা বোধ হয় বেশিদিন এই গন্ধমাদন টানিতে পারবে না।”- কে, কাকে একথা বলেছিল? বক্তার একথা বলার কারণ কী? [২+৩]
উত্তর:
উৎস: মতি নন্দী রচিত ক্রীড়াকেন্দ্রিক কিশোর উপন্যাস ‘কোনি’।
বক্তা ও উদ্দিষ্ট ব্যক্তি:
উদ্ধৃত কৌতুকমিশ্রিত কিন্তু বাস্তবসম্মত কথাটি রেলে চাকরিরত বন্ধু বিষ্টুচরণ ধর বলেছিল তাঁর আজন্ম বন্ধু তথা সাঁতারের একনিষ্ঠ ট্রেনার ক্ষিতীশ সিংহ (ক্ষিদ্দা)-কে।
বক্তার একথা বলার কারণ:
ক্ষিতীশ সিংহের অত্যন্ত ভারী, স্থূলকায় ও মেদবহুল শরীর নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতেই বিষ্টুচরণ পৌরাণিক ‘গন্ধমাদন’ পর্বতের সঙ্গে তুলনা টেনে এমন মন্তব্য করেছিল:
-
ক্ষিতীশের অস্বাভাবিক স্থূলতা: ক্ষিতীশ সিংহের শারীরিক ওজন ও মেদের পরিমাণ এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে তা যেকোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে বিপজ্জনক। চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাধারণ নিয়মেই অতিরিক্ত মেদ ও চর্বির বোঝা টানতে হৃদযন্ত্র বা হার্টকে মাত্রাতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়।
-
উপযুক্ত ব্যায়ামের অভাব ও অনিয়ম: ক্ষিতীশ নিজে সারাজীবন শত শত ছেলেমেয়েকে কঠোর অনুশাসনে রেখে ঘাম ঝরিয়ে সাঁতার শিখিয়েছেন, কিন্তু নিজের শরীরের পরিচর্যা বা ব্যায়ামের ব্যাপারে তিনি হয়ে পড়েছিলেন চরম উদাসীন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পুলে দাঁড়িয়ে অন্যদের নির্দেশ দিলেও তাঁর নিজের শারীরিক সঞ্চালন একেবারেই কমে গিয়েছিল।
-
বন্ধু হিসেবে আন্তরিক শঙ্কা: বিষ্টুচরণ ছিলেন ক্ষিতীশের ঘনিষ্ঠ অন্তরঙ্গ বন্ধু। বন্ধুদের মধ্যে যেমন পরিহাস থাকে, তেমনি থাকে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও পারস্পরিক স্বাস্থ্যচিন্তা। ক্ষিতীশের মতো জেদি ও একবগ্গা মানুষ নিজের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে অকালে যাতে হৃদরোগে আক্রান্ত না হন, সেই চিকিৎসাসুলভ বিপদের কথা স্মরণ করাতেই বিষ্টুচরণ ক্ষিতীশের ওই বিশালাকার দেহকে ব্যঙ্গার্থে ‘গন্ধমাদন’ পর্বত বলে আখ্যা দিয়েছিল।
পরোক্ষভাবে বন্ধুকে কঠোর ডায়েট এবং শরীরচর্চার মাধ্যমে মেদ কমানোর তাগিদ দেওয়াই ছিল বিষ্টুচরণের এই তির্যক মন্তব্যের মূল উদ্দেশ্য।
৮.৩ “ফাইট, কোনি ফাইট” – সাধারণ মেয়ে থেকে চ্যাম্পিয়ান হয়ে উঠতে গিয়ে কোনিকে কী ধরণের ‘ফাইট’ করতে হয়েছিল সংক্ষেপে তার পরিচয় দাও। [৫]
উত্তর:
ভূমিকা:
মতি নন্দীর ‘কোনি’ উপন্যাসে ‘ফাইট, কোনি ফাইট’ কেবল একটি স্লোগান নয়; এটি হলো চরম সামাজিক প্রতিকূলতা, ক্ষুধা এবং আঞ্চলিক রাজনীতির নোংরামির বিরুদ্ধে এক সর্বহারা দরিদ্র কিশোরীর অপরাজেয় অস্তিত্বের লড়াইয়ের রণধ্বনি। শ্যামপুকুরের বস্তির এক সাধারণ অবহেলিত মেয়ে থেকে জাতীয় সাঁতারে ভারতের সেরা চ্যাম্পিয়ন হয়ে ওঠার পেছনে কোনিকে বহুমাত্রিক লড়াই বা ফাইট লড়তে হয়েছিল:
-
দারিদ্র্য ও ক্ষুধার বিরুদ্ধে লড়াই:
কোনির জীবনসংগ্রাম শুরু হয়েছিল তার নিজের কুঁড়েঘর থেকেই। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম বড়োভাই কমল অকালে যক্ষ্মায় মারা যাওয়ার পর পুরো পরিবারটি অথৈ জলে পড়ে। দুবেলা দুটি ভাতের সংস্থান ছিল না তাদের। ক্ষিতীশ সিংহের দেওয়া দুটি করে ডিম ও কলার পুষ্টি সম্বল করে পেটের তীব্র জ্বালা চেপে কোনিকে দিনের পর দিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা কনকনে ঠাণ্ডা জলে কঠোর অনুশীলন করতে হয়েছিল।
-
শারীরিক ক্লান্তির বিরুদ্ধে লড়াই:
ক্ষিতীশের প্রশিক্ষণ কোনো সাধারণ সাঁতারের তালিম ছিল না, তা ছিল এক নির্মম পরীক্ষা। ভোর থেকে শুরু করে একটানা ক্লান্তিহীন শত শত ল্যাপ সাঁতার কাটা, স্টপওয়াচের সেকেন্ডের কাঁটার বিরুদ্ধে দৌড় এবং ক্ষিদ্দার একবগ্গা শাসনের মুখে নিজের পেশির অসহ্য যন্ত্রণা ও ক্লান্তি জয় করাই ছিল কোনির দৈনন্দিন রুটিন।
-
সামাজিক হীনম্মন্যতা ও ক্লাব-রাজনীতির বাধা:
কোনির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড়ো প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল জুপিটার ও অ্যাপোলো ক্লাবের তথাকথিত বনেদি উচ্চবিত্তরা। গরিব বস্তিবাসী হওয়ায় তাকে জুপিটারের পুল থেকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। ক্ষিতীশকে হেনস্থা করার জন্য কোনির সাঁতারের অগ্রগতিতে পদে পদে কাঁটা বিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
-
জাতীয় স্তরে চক্রান্তের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ফাইট:
মাদ্রাজ (চেন্নাই) জাতীয় সাঁতার প্রতিযোগিতায় বাংলা দলের ম্যানেজার হরিচরণ ও প্রণবেন্দু বাবুরা নোংরা চক্রান্ত করে কোনিকে কোনো ব্যক্তিগত ইভেন্টে নামতেই দেয়নি। তাকে টিম থেকে বাদ দেওয়ার ঘৃণ্য চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মহারাষ্ট্রের জাতীয় চ্যাম্পিয়ন রমা যোশীর বিরুদ্ধে রিলে রেসের শেষ পর্বে বাংলার মান বাঁচাতে বাধ্য হয়ে কোনিকে নামানো হয়।
গ্যালারি থেকে ভেসে আসা ক্ষিদ্দার জাদুকরি আর্তনাদ— “ফাইট, কোনি ফাইট”— বুকে ধারণ করে কোনি জলে নিজের সর্বশক্তি উজাড় করে দেয়। শেষ ল্যাপে রমা যোশীকে পেছনে ফেলে প্রথম স্পর্শ করে সে ছিনিয়ে আনে জয়। এভাবেই ব্যক্তিগত ক্ষুধা, অপমান ও নোংরা চক্রান্তকে পায়ের তলায় পিষে ফেলে কোনি সাধারণ বস্তির মেয়ে থেকে জাতীয় চ্যাম্পিয়নে রূপান্তরিত হয়।
৯. চলিত বাংলায় অনুবাদ করো: [৪]
মূল ইংরেজি অনুচ্ছেদ:
“We are living in an age of Science. Science has discovered and invented many things. Electricity is one of the greatest gifts of Science to man. Electricity has almost changed the mode of our life.”
উত্তর:
বঙ্গানুবাদ (সাধু ও চলিত মিশ্রণ বর্জিত প্রামাণ্য চলিত রূপ):
আমরা বিজ্ঞানের যুগে বাস করছি। বিজ্ঞান বহু নতুন বিষয় আবিষ্কার ও উদ্ভাবন করেছে। বিদ্যুৎ হলো মানবজাতির প্রতি বিজ্ঞানের সর্বশ্রেষ্ঠ উপহারগুলির অন্যতম। বিদ্যুৎ আমাদের জীবনযাত্রার ধরন প্রায় সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে।
১০. কম-বেশি ১৫০ শব্দে যে-কোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও: [১ × ৫ = ৫]
১০.১ ‘সাবধানে চালাও জীবন বাঁচাও’ – এই বিষয়ে দুই বন্ধুর মধ্যে একটি কাল্পনিক সংলাপ রচনা করো। [৫]
উত্তর:
(স্থান: স্কুলের মাঠের এক কোণে; দুই বন্ধু অর্ক ও সৌভিকের মধ্যে পথনিরাপত্তা বিষয়ক কথোপকথন)
অর্ক: কী রে সৌভিক, আজ স্কুলে আসতে তোর এত দেরি হলো যে?
সৌভিক: আর বলিস না ভাই! চৌমাথার মোড়ে এক বেপরোয়া বাইক আরোহী দ্রুত গতিতে সিগন্যাল ভাঙতে গিয়ে উলটো দিক থেকে আসা একটা বাসের সঙ্গে ধাক্কা খেল। এক নিদারুণ পথদুর্ঘটনা!
অর্ক: কী সাংঘাতিক! সেই আরোহী সুস্থ আছেন তো?
সৌভিক: হেলমেট না পরায় মাথায় প্রচণ্ড চোট লেগেছে। রক্তে ভেসে যাচ্ছিল রাস্তা। পুলিশ দ্রুত এসে হাসপাতালে পাঠাল।
অর্ক: প্রত্যহ খবরের কাগজ খুললেই এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনার খবর দেখতে পাই। মানুষ যদি একটু সচেতন হতো! সরকারের ‘সেফ ড্রাইভ সেভ লাইফ’ বা ‘সাবধানে চালাও জীবন বাঁচাও’ প্রচার অভিযান কি তবে নিছক পোস্টারেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
সৌভিক: একদম ঠিক বলেছিস। পথনিরাপত্তা কেবল প্রশাসনের একার দায়িত্ব নয়, পথচারী ও চালক— উভয়েরই সচেতনতা জরুরি। দ্রুত পৌঁছানোর অন্ধ মোহে মানুষ ট্র্যাফিক আইন অমান্য করে, ফোনে কথা বলতে বলতে গাড়ি চালায় কিংবা বাইকে হেলমেট আর গাড়িতে সিটবেল্ট পরাকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে।
অর্ক: ঠিক তাই। জীবনের তুলনায় কোনো গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়াহুড়োই বেশি মূল্যবান হতে পারে না। “সময়ের চেয়ে জীবনের দাম অনেক বেশি”— এই বোধটা সবার আগে জাগ্রত হওয়া দরকার।
সৌভিক: আমাদেরও উচিত নিজ নিজ পাড়ায় এবং বন্ধুদের মধ্যে পথনিরাপত্তা সংক্রান্ত নিয়মাবলি মেনে চলার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া। প্রত্যেকে সংযত হয়ে গাড়ি চালালেই বহু অমূল্য প্রাণ অকালে ঝরে পড়া থেকে রক্ষা পাবে।
অর্ক: সহমত ভাই। চল, এবার ক্লাসের সময় হয়ে গেছে, ভেতরে যাই।
১০.২ ‘রক্তদান জীবনদান’- এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন রচনা করো। [৫]
উত্তর:
যুব সমাজের উদ্যোগে স্বেচ্ছায় রক্তদান শিবির: এক মহতী অঙ্গীকার
নিজস্ব সংবাদদাতা, বারাসাত, ১৫ আগস্ট, ২০২৬:
দেশের স্বাধীনতা দিবসের পুণ্যলগ্নে স্থানীয় ‘নবপ্রভাত যুব সঙ্ঘ’-এর প্রাঙ্গণে আয়োজিত হয়ে গেল এক বর্ণাঢ্য স্বেচ্ছায় রক্তদান শিবির। “রক্ত দিন, জীবন বাঁচান”— এই মানবিক মন্ত্রকে মূল পাথেয় করে আয়োজিত এই বিশেষ শিবিরে স্থানীয় মানুষের উপস্থিতি ও উদ্দীপনা ছিল লক্ষণীয়।
সকাল ৯ ঘটিকায় স্থানীয় বিশিষ্ট চিকিৎসক ও সমাজসেবকদের উপস্থিতিতে প্রদীপ প্রজ্বালনের মাধ্যমে শিবিরের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে। বারাসাত জেলা হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকমণ্ডলী এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মীদের একটি সুদক্ষ দল সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক ও স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতিতে রক্ত সংগ্রহের পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করেন। রক্তদাতাদের শারীরিক সুস্থতা, রক্তচাপ, হিমোগ্লোবিনের মাত্রা এবং ওজন সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা করে তবেই রক্ত গ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়।
শিবিরের বিশেষ আকর্ষণ ছিল তরুণ প্রজন্মের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। বহু তরুণ-তরুণী জীবনের প্রথমবার রক্তদান করে মানবিক কর্তব্যে শামিল হন। এছাড়া বহু অভিজ্ঞ রক্তদাতাও এগিয়ে আসেন। সারাদিনের এই শিবিরে মোট ৭৫ জন পুরুষ ও ৩৫ জন নারীসহ সর্বমোট ১১০ ইউনিট রক্ত সংগৃহীত হয়। প্রতিটি রক্তদাতার হাতে পুষ্টিকর খাবার, ফলের প্যাকেট এবং রক্তদান পর্ষদের আনুষ্ঠানিক শংসাপত্র তুলে দেওয়া হয়।
সমাপনী ভাষণে হাসপাতালের প্রধান রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ জানান, কৃত্রিম উপায়ে রক্ত তৈরি করা অসম্ভব; মুমূর্ষু রোগীকে বাঁচাতে একমাত্র রক্তদাতার দেওয়াই রক্তের বিকল্প নেই। কুসংস্কার ও ভয় দূর করে এই ধরনের নিয়মিত স্বেচ্ছায় রক্তদান রক্তের আকাল দূর করতে এবং অমূল্য মানবজীবন বাঁচাতে এক মাইলফলক হয়ে থাকবে।
১১. কম-বেশি ৪০০ শব্দে যে-কোনো একটি বিষয় অবলম্বনে প্রবন্ধ রচনা করো: [১০]
(নিয়ম অনুযায়ী প্রদত্ত ৪টি প্রবন্ধের সবকটিরই পূর্ণাঙ্গ ও উচ্চমানসম্পন্ন খসড়া প্রস্তুত করা হলো)
১১.১ বিজ্ঞানমনস্কতা ও কুসংস্কার [১০]
“যুক্তিবাদী মনই মানুষের পরম আশ্রয়, অন্ধবিশ্বাস তার চিরন্তন কারাগার।”
ভূমিকা:
একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক মানবসভ্যতা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় সাফল্যে ভাস্বর। মহাকাশ অভিযান থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা— সর্বত্রই বিজ্ঞানের জয়জয়কার। অথচ এই আধুনিকতার আলোকোজ্জ্বল প্রকোষ্ঠের ঠিক পাশেই রয়ে গেছে অন্ধকারাচ্ছন্ন কুসংস্কারের দীর্ঘ ছায়া। বিজ্ঞান মানুষকে যুক্তি, কার্যকারণ ও সত্যের সন্ধান দেয়; আর কুসংস্কার মানুষকে ঠেলে দেয় অন্ধ আনুগত্য ও ভয়ের গহ্বরে। তাই বিজ্ঞানের অগ্রগতির যুগে প্রকৃত মানবমুক্তির জন্য প্রয়োজন ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে বিজ্ঞানমনস্কতার বিকাশ।
কুসংস্কারের স্বরূপ ও শিকড়:
যে বিশ্বাসের পেছনে কোনো যুক্তিসঙ্গত কার্যকারণ সম্পর্ক নেই, যা নিছক কাল্পনিক ভয়, অন্ধ পরম্পরা বা অন্ধবিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তা-ই কুসংস্কার। অশিক্ষা, দারিদ্র্য এবং মানসিক নিরাপত্তাহীনতা থেকেই কুসংস্কারের জন্ম হয়। একদা প্রকৃতির রহস্যময় শক্তিকে বুঝতে না পেরে আদিম মানুষ অলৌকিক শক্তির কল্পনা করেছিল। কিন্তু সভ্যতার চরম উৎকর্ষের যুগেও যখন ডাইনি অপবাদ দিয়ে মানুষ হত্যা, সাপে কাটলে ওঝা-গুণিনের কাছে যাওয়া, তুকতাক, কিংবা রোগমুক্তির নামে তথাকথিত ধর্মব্যবসায়ীদের পদতলে সাধারণ মানুষের আত্মসমর্পণ দেখা যায়, তখন তা সমাজপ্রগতির মুখে চরম চপেটাঘাত হানে।
বিজ্ঞানমনস্কতা কী?
বিজ্ঞানমনস্কতা কেবল পদার্থবিদ্যা, রসায়ন বা জীববিজ্ঞানের বই পড়া বা ডিগ্রি অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি হলো জীবনের একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি বা জীবনবোধ। বিজ্ঞানমনস্ক মন কোনো বিষয়কে অন্ধভাবে বা কারও কথায় বিশ্বাস করে না; বরং তা পর্যবেক্ষণ, যুক্তি, বিশ্লেষণ এবং প্রমাণের কষ্টিপাথরে যাচাই করে সত্যকে গ্রহণ করে। বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় বা মেঘনাদ সাহার মতো মনীষীরা আমাদের এই যুক্তিবাদী চিন্তার শিক্ষাই দিয়ে গেছেন।
বিজ্ঞানমনস্কতা প্রসারে বাধা:
আমাদের সমাজে শিক্ষাব্যবস্থা অনেক সময়ই কেবল ডিগ্রি প্রদানমুখী, তা মানুষের অন্তরের চেতনার রূপান্তর ঘটাতে পারে না। ফলে উচ্চশিক্ষিত অনেক ব্যক্তিও বাস্তব জীবনে ব্যক্তিগত স্বার্থ, ভাগ্যোন্নয়ন বা ভয়ের বশবর্তী হয়ে গ্রহরত্ন ধারণ, জ্যোতিষশাস্ত্রের মোহ বা অলৌকিক দৈব শক্তিতে বিশ্বাস স্থাপন করেন। এর সঙ্গে যোগ হয় সমাজবিরোধী কায়েমি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর ধর্মীয় গোঁড়ামি ও ভণ্ডামি।
প্রতিকারের উপায় ও ছাত্রসমাজের ভূমিকা:
কুসংস্কার দূর করতে হলে পাঠ্যপুস্তকের শিক্ষার পাশাপাশি বাস্তবমুখী যুক্তিবাদী চেতনার প্রসার ঘটাতে হবে। সরকারি স্তরে কঠোর আইন প্রয়োগ যেমন জরুরি, তেমনি প্রয়োজন বিজ্ঞান মঞ্চ ও নাগরিক সমাজ কর্তৃক তৃণমূল স্তরে বিজ্ঞান সচেতনতা শিবির গড়ে তোলা। এই লড়াইয়ে সর্বাগ্রে এগিয়ে আসতে হবে ছাত্রসমাজকে। তরুণ প্রজন্মই পারে কুসংস্কারমুক্ত, সুস্থ ও যুক্তিনির্ভর এক নতুন ভোর রচনা করতে।
উপসংহার:
বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গঠনের অর্থ ঐতিহ্য বা নীতিবোধ বিসর্জন দেওয়া নয়, বরং ক্ষতিকর আবর্জনাকে ঝেড়ে ফেলে যুক্তির আলোয় সত্যকে আবিষ্কার করা। কবিগুরুর ভাষায় তাই আমাদের সমস্বরে প্রার্থনা হওয়া উচিত— “চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির, / জ্ঞান যেথা মুক্ত…”।
১১.২ বাংলার উৎসব [১০]
“উৎসবের দিনে মানুষ একলা নহে, সেদিন সে নিখিল মানবের সহিত যুক্ত।”
— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ভূমিকা:
উৎসব বাঙালির প্রাণস্পন্দন। দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমি, কঠোর জীবনসংগ্রাম এবং ক্লান্তিকর রুটিন থেকে মুক্তি পেতে মানুষ বারবার উৎসবের আনন্দলোকে অবগাহন করে। এই কারণেই বাঙালিকে নিয়ে প্রচলিত শাশ্বত প্রবাদ হলো— “বারো মাসে তেরো পার্বণ”। বাংলার উৎসব কোনো সংকীর্ণ আচারসর্বস্ব অনুষ্ঠান নয়; তা হলো সর্বস্তরের মানুষের মিলনক্ষেত্র এবং মহামিলনের মিলনমেলা।
বাংলার উৎসবের বৈচিত্র্য ও শ্রেণিবিভাগ:
বাংলার উৎসবের রূপ ও বৈচিত্র্য বহুমুখী। বিষয় ও চরিত্রভেদে এই উৎসবগুলিকে মূলত চারটি ভাগে ভাগ করা যায়:
-
ধর্মীয় উৎসব: সনাতন ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত দুর্গাপূজা বাঙালির শ্রেষ্ঠ জাতীয় উৎসব। শরৎকালের কাশফুলের দোলা আর শিউলি ঝরা ভোরে আগমন ঘটে মা দুর্গার। এই পূজায় ধনী-দরিদ্র, জাত-পাত ভুলে সকলে এক কাতারে শামিল হয়। এছাড়া কালীপূজা, দীপাবলি, সরস্বতী পূজা, রথযাত্রা, জগদ্ধাত্রী পূজা বিপুল উদ্দীপনায় উদযাপিত হয়। তেমনি মুসলিম সম্প্রদায়ের পবিত্র ঈদুল ফিতর ও ঈদুজ্জোহা এবং খ্রিস্টান সমাজের বড়োদিন সমগ্র বাংলায় পরম সৌহার্দ্যে পালিত হয়।
-
ঋতুভিত্তিক উৎসব: ঋতুবৈচিত্র্যের সঙ্গে বাংলার উৎসবের নাড়ির যোগ। বসন্তে রঙের দোলা নিয়ে আসে দোলযাত্রা ও বসন্তোৎসব; অঘ্রানে কৃষকের ঘরে ঘরে উদযাপিত হয় নতুন ধানের নবান্ন উৎসব; আর পৌষের কনকনে শীতে অনুষ্ঠিত হয় পৌষপার্বণ ও পিঠেপুলির উৎসব।
-
সামাজিক ও পারিবারিক উৎসব: রাখিবন্ধন, ভাইফোঁটা, জামাইষষ্ঠীর মতো সামাজিক উৎসবগুলি রক্তের সম্পর্ক ও মানবিক ভালোবাসার বন্ধনকে দৃঢ় করে তোলে।
-
জাতীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব: নেতাজি জন্মজয়ন্তী, প্রজাতন্ত্র দিবস, স্বাধীনতা দিবসের পাশাপাশি বাঙালির সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র হলো পঁচিশে বৈশাখ (রবীন্দ্রজয়ন্তী), আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এবং কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা।
উৎসবে সামাজিক সম্প্রীতির মেলবন্ধন:
বাংলার উৎসবের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক হলো এর ধর্মনিরপেক্ষ ও সর্বজনীন চরিত্র। দুর্গোৎসবের আলোর রোশনাই কিংবা মণ্ডপসজ্জায় ধর্মের কোনো গণ্ডি থাকে না; মুসলমান বন্ধুর বাড়িতে ঈদের মিষ্টিমুখ কিংবা বড়োদিনে পার্ক স্ট্রিটের আলোকমালায় সমস্ত বাঙালি এক হয়ে যায়। ধর্ম যার যার হতে পারে, কিন্তু উৎসবের আনন্দ সবার।
উৎসবে আধুনিকতার কুপ্রভাব:
আধুনিককালে উৎসবের আন্তরিকতার ওপর বিজ্ঞাপনী বাণিজ্য, অসুস্থ প্রতিযোগিতা, কানফাটা শব্দদূষণ এবং অপসংস্কৃতির কালো ছায়া পড়ছে। উৎসবের অনাবিল আনন্দ আজ অনেক ক্ষেত্রেই কৃত্রিম বাহুল্যে পর্যবসিত হচ্ছে, যা বর্জন করা একান্ত প্রয়োজন।
উপসংহার:
উৎসব মানুষের আত্মিক শুচিতা ফেরায় এবং সমাজকে ভালোবাসার অদৃশ্য সুতোয় গেঁথে রাখে। সমস্ত ক্ষুদ্রতা ও বিভেদের দেওয়াল ভেঙে বাঙালি যেন যুগে যুগে উৎসবের আঙিনায় দাঁড়িয়ে কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলতে পারে— “সবার পরশে পবিত্র-করা তীর্থনীরে”।
১১.৩ তোমার জীবনের একটি স্মরণীয় অভিজ্ঞতা [১০]
“স্মৃতি সে তো ফেলে আসা রূপকথা, বুকের গভীরে যার অম্লান বাস।”
ভূমিকা:
মানবজীবন কতগুলি চলমান ঘটনার নিরবচ্ছিন্ন স্রোত। জীবনের সব দিন বা সব ঘটনা মনের গভীরে রেখাপাত করে না; অধিকাংশই কালের অতল গহ্বরে হারিয়ে যায়। কিন্তু কিছু কিছু বিরল অভিজ্ঞতা স্মৃতির মণিমঞ্জুষায় এমনভাবে সংরক্ষিত হয়ে থাকে, যা শতবর্ষ পরেও অমলিন ও উজ্জ্বল থাকে। আমার জীবনেও এমন একটি অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা ঘটেছিল গত বছর মাধ্যমিক পরীক্ষার আগের শীতে, সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এক গ্রামে ভ্রমণের সময়।
ঘটনার প্রেক্ষাপট:
শীতের ছুটিতে পরিবারের সঙ্গে আমি গিয়েছিলাম দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার সুন্দরবনের প্রত্যন্ত গোসাবা ও তার সংলগ্ন পাখিরালয় অঞ্চলে। ঘন সবুজ ম্যানগ্রোভ অরণ্য, পশুপাখির কলকাকলি এবং সুন্দরী-গরান গাছের শ্বাসমূলে ঘেরা সেই জলজ পরিবেশ প্রথম থেকেই আমার মনকে এক অপার্থিব রোমাঞ্চে ভরিয়ে দিয়েছিল।
অভিজ্ঞতার সেই দিনটি:
ভ্রমণের তৃতীয় দিনে আমরা একটি ছোটো দেশি মোটরচালিত নৌকায় করে বিদ্যাধরী ও মাতলা নদীর মিলনস্থলের খাঁড়ি ধরে গভীর অরণ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। শীতের মিষ্টি রোদ জলে প্রতিফলিত হয়ে এক মোহময় পরিবেশ তৈরি করেছিল। দুপুর নাগাদ নদী যখন খাঁড়ির নির্জন বাঁকে প্রবেশ করল, হঠাৎ নৌকার মাঝি ইঞ্জিন বন্ধ করে আঙুল তুলে এক রহস্যময় ইঙ্গিত করল। বনের কাদার চরে রোদের ওমে শুয়েছিল একটি সুবিশাল জলজ কুমির। কিন্তু বিস্ময়ের চূড়ান্ত তখনো বাকি ছিল।
কিছু দূর যেতেই ঘন বনের ওপার থেকে ভেসে এল মৃদু গম্ভীর গর্জন। নিঃশ্বাস বন্ধ করে খাঁড়ির এক সংকীর্ণ বাঁকে তাকাতেই বুকের রক্ত যেন হিম হয়ে গেল— নদীর জল খেতে নেমেছে সুন্দরবনের সাক্ষাৎ ঈশ্বর, স্বয়ং রয়েল বেঙ্গল টাইগার! তার সোনালি শরীরে কালো ডোরাকাটা দাগ, তেজস্বী দুটি চোখের দৃষ্টি এবং নিঃশব্দ পদচারণা আমাকে সম্পূর্ণ মোহগ্রস্ত ও স্তম্ভিত করে দিল। প্রকৃতির কোলে সাক্ষাৎ বন্য রাজকীয়তার সেই রূপ আমি আগে কেবল টেলিভিশনের পর্দায় দেখেছি, কিন্তু চোখের সামনে এমন আদিম সৌন্দর্যের মুখোমুখি হওয়ার অনুভূতি ছিল বর্ণনাতীত শিহরণ ও ভীতি মিশ্রিত।
জীবনবোধের রূপান্তর:
বাঘটি নীরবে জলপান করে ধীর পায়ে আবার ঘন বাদাবনে মিলিয়ে গেল। কিন্তু সেই দৃশ্য আমার কিশোর মনে চিরতরে একটি বড়ো উপলব্ধি এনে দিল— প্রকৃতি কত বিশাল, সুন্দর ও ভয়াল! সুন্দরবনের মানুষের কঠিন জীবনসংগ্রাম, খাঁড়িতে মাছ ও কাঁকড়া ধরতে গিয়ে বাঘের আক্রমণের নিত্যদিনের ঝুঁকি এবং প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকার সত্য আমাকে গভীর জীবনবোধে ঋদ্ধ করল।
উপসংহার:
সেই অরণ্যের নীরবতা, খাঁড়ির নোনা হাওয়া এবং রয়েল বেঙ্গল টাইগারের শান্ত অথচ গম্ভীর উপস্থিতির দৃশ্য আজও আমার চোখের সামনে ভাস্বর হয়ে ওঠে। নাগরিক জীবনের কৃত্রিম কোলাহলের মাঝেও সুন্দরবনের সেই নির্জন মুহূর্তটি আমার জীবনের চিরভাস্বর এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে।
১১.৪ একটি নদীর আত্মকথা [১০]
“বহু দেশ দেখিয়াছি বহু নদ-দলে, / কিন্তু এ স্নেহের তৃষ্ণা মিটে কার জলে?”
— মাইকেল মধুসূদন দত্ত
ভূমিকা:
আমি এক বহতা নদী। যুগে যুগে মানবসভ্যতার বিকাশ ও উত্থান-পতনের নীরব সাক্ষী আমি। পর্বতগাত্রের শুভ্র তুষারগলা ধারা থেকে জন্ম নিয়ে আমি অনন্তকাল ধরে ছুটে চলেছি সাগরের অনন্ত মিলনের পানে। আমার বুকে নেই কোনো অহংকার, আমার যাত্রাপথ কেবল দেওয়ার— অফুরন্ত জীবন ও প্রাণের প্রবাহ বিলিয়ে দেওয়াই আমার অস্তিত্বের পরম সার্থকতা। আজ জীবনের প্রান্তে দাঁড়িয়ে আমি আমার সুখ-দুঃখের স্মৃতিচারণা করতে বসেছি।
আমার জন্ম ও শৈশব:
হিমালয়ের এক নিভৃত, বরফাবৃত গুহা থেকে আমার জন্ম হয়েছিল। সেই শৈশবে আমি ছিলাম এক উদ্দাম, চঞ্চল পাহাড়ি ঝরনা। পাথরের বাধা ভেঙে, নুড়িপাথর ভাসিয়ে কলকল ছন্দে নেচে নেচে আমি সমতলের বুকে নেমে এসেছিলাম। তখন আমার গতি ছিল তীব্র, মন ছিল বন্ধনহীন। কোনো ক্লান্তি আমাকে স্পর্শ করতে পারত না।
যৌবনের ঐশ্বর্য ও লোকালয় গড়ার ইতিহাস:
সমতলে এসে আমার রূপ শান্ত ও গভীর হলো। আমার দুপাশে গড়ে উঠল জনবসতি, পল্লী ও সুবিশাল নগর। কৃষকেরা আমার শীতল জলে তাদের তৃষ্ণার্ত খেত ভরিয়ে তুলল; জন্ম নিল সবুজ শস্যশ্যামলা প্রান্তর। বণিকরা আমার বুকে নৌকা ভাসিয়ে বাণিজ্যের বিস্তার ঘটাল। কত কবি আমার তীরে বসে কবিতা লিখলেন, কত বাউল আমার স্রোতে জীবনের গান গাইলেন। আমার পুণ্যসলিলে প্রতিদিন স্নান করে মানুষ তাদের অন্তরের ক্লান্তি দূর করেছে। মানুষের এই ভালোবাসা ও আনন্দ দেখে আমার বুক গর্বে ভরে উঠত।
যন্ত্রণার অধ্যায় ও বর্তমান বিপন্নতা:
কিন্তু কালের নিয়মে মানুষের নিঃস্বার্থ রূপ বদলে গেল। স্বার্থপর ও অকৃতজ্ঞ মানবসমাজ আজ আমার অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে তুলেছে। আধুনিক কারখানাগুলির বিষাক্ত বর্জ্য, নোংরা নর্দমার দূষিত জল এবং প্লাস্টিকের স্তূপ প্রতিনিয়ত আমার স্বচ্ছ বুকে ঢেলে দেওয়া হচ্ছে। আমার নির্মল জল আজ দুর্গন্ধযুক্ত ও বিষাক্ত। নদীর বুক চিরে গড়ে উঠেছে কংক্রিটের বাঁধ, যা আমার স্বাভাবিক চলার ছন্দকে রুদ্ধ করে দিয়েছে। আমার তলদেশ আজ পলিতে ভরাট, ফলে বর্ষায় সামান্য বৃষ্টিতেই আমি দুই কূল ভাসিয়ে বন্যা সৃষ্টি করতে বাধ্য হই, আর মানুষ তার জন্য আমাকেই অভিশাপ দেয়।
আমার অন্তিম আকুলতা ও উপসংহার:
আমি আজ বার্ধক্যের দোড়গোড়ায় ক্লান্ত ও শীর্ণ। তবুও আমি থেমে থাকতে পারি না; সাগরের সঙ্গে একাত্ম হওয়াই যে আমার নিয়তি। কিন্তু আমার কাতর মিনতি মানুষের কাছে— তোমরা আমাকে হত্যা কোরো না। নদী বাঁচলে তবেই বাঁচবে মানবসভ্যতা ও সবুজ পৃথিবী। আমার এই কলতান যেন মানুষের শুভবুদ্ধিকে জাগিয়ে তোলে— এইটুকুই আমার আজীবনের শেষ প্রার্থনা।
📌 অনুশীলন রিসোর্স:
সর্বশেষ মাধ্যমিক পরীক্ষার সম্পূর্ণ প্রশ্নপত্রটি দেখে নাও এবং নিজের প্রস্তুতি যাচাই করো।
👉 ২০২৬ সালের মাধ্যমিক বাংলা মূল প্রশ্নপত্র PDF ডাউনলোড করুন
বহিরাগত পরীক্ষার্থীদের প্রশ্ন সংক্রান্ত জরুরি নির্দেশিকা:
মাধ্যমিকের মূল প্রশ্নপত্রটি কেবল নিয়মিত শিক্ষার্থীদের ৯০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষার জন্য তৈরি, যেখানে বাকি ১০ নম্বর স্কুলের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে (CCE) বরাদ্দ থাকে। বহিরাগত (External/CC) পরীক্ষার্থীদের যেহেতু কোনো প্রোজেক্ট থাকে না, তাই তাদের মোট ১০০ নম্বর পূর্ণ করতে পর্ষদ আলাদাভাবে ১০ নম্বরের একটি পৃথক প্রশ্নপত্র সরবরাহ করে; নিয়মিত শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্তি এড়াতে এটি মূল বুকলেটে রাখা হয় না। বহিরাগত শিক্ষার্থীরা এই অংশের প্রস্তুতির জন্য মূল পাঠ্যবই পুঙ্খানুপুঙ্খ পড়ার পাশাপাশি টেস্ট পেপার ও বিগত বছরের সংকলন অনুশীলন করতে পারো, অথবা নিজ স্কুল ও পরীক্ষাকেন্দ্রের শিক্ষকদের কাছ থেকে এই অতিরিক্ত প্রশ্নপত্রটি সংগ্রহ করে সমাধান করতে পারো।