আজকে আমরা আধুনিক ইতিহাস চর্চার সবচেয়ে প্রভাবশালী ধারা ‘অ্যানালস স্কুল’ সম্পর্কে জানব। এই গোষ্ঠীটিই প্রথম দেখিয়েছিল যে ইতিহাস মানে কেবল রাজা-রানীর গল্প নয়, বরং সমাজ ও ভূগোলের এক সামগ্রিক সমন্বয়।
১. উৎপত্তি ও তাৎপর্য (Origin & Significance)
অ্যানালস স্কুলের সূচনা
আধুনিক ইতিহাস চর্চার জগতে ১৯২৯ সালে ফ্রান্সে এক যুগান্তকারী ধারার সূচনা হয়, যা ‘অ্যানালস স্কুল’ (Annales School) নামে পরিচিত।
জার্নালের তাৎপর্য
এই ধারার সূত্রপাত ঘটে ‘Annales d’histoire économique et sociale’ (১৯২৯) নামক একটি বিখ্যাত পত্রিকা বা জার্নাল প্রকাশের মধ্য দিয়ে। এই পত্রিকার তাৎপর্য হলো:
-
এটি প্রথাগত ইতিহাস চর্চায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে।
-
এর আগে ইতিহাস বলতে কেবল রাজনৈতিক ঘটনা, যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং রাজবংশের উত্থান-পতনের বিবরণ বোঝাতো।
-
এই পত্রিকা প্রমাণ করে যে, রাজনীতি বা যুদ্ধ নয়, বরং মানুষের দীর্ঘমেয়াদী সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিই হলো ইতিহাসের মূল চালিকাশক্তি।
২. প্রতিষ্ঠাতা ও তাঁদের মূল দর্শন (The Founders)
অ্যানালস গোষ্ঠীর প্রধান দুই প্রতিষ্ঠাতা হলেন দুই প্রখ্যাত ফরাসি ঐতিহাসিক: ১. মার্ক ব্লক (Marc Bloch) ২. লুসিয়েন ফেভার (Lucien Febvre)
মূল দর্শন
তাঁদের মূল দর্শন ছিল ইতিহাসকে শুধু রাজা-মহারাজার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অস্তিত্ব এবং জীবনযাত্রাকে ইতিহাসের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনা। তাঁরা মনে করতেন, কোটি কোটি সাধারণ মানুষের জীবন, অর্থনীতি, এবং পারিপার্শ্বিক সমাজকে বাদ দিয়ে কোনো দেশের প্রকৃত ইতিহাস লেখা সম্ভব নয়।
বিঃদ্রঃ: মার্ক ব্লকের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘The Historian’s Craft’ আধুনিক ইতিহাসবিদদের কাছে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
৩. মূল পদ্ধতি: “সামগ্রিক ইতিহাস” (Core Methodology: Total History)
অ্যানালস ঐতিহাসিকরা ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে “সামগ্রিক ইতিহাস” (Total History) বা একটি পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনার ওপর জোর দেন।
কীভাবে তাঁরা ইতিহাসকে পরিবর্তন করলেন?
-
আন্তঃবিভাগীয় দৃষ্টিভঙ্গি (Interdisciplinary Approach): প্রথাগত ইতিহাসে কেবল রাজনৈতিক নেতাদের বিবরণ থাকত। কিন্তু অ্যানালস স্কুল ইতিহাস চর্চার সাথে সমাজবিজ্ঞান, ভূগোল, ভাষাতত্ত্ব (linguistics) এবং লোকসংস্কৃতিকে (folklore) যুক্ত করে।
-
নতুন বিষয়ের অন্তর্ভুক্তি: তাঁরা প্রমাণ করেন যে, রাজা বা যুদ্ধের বদলে একটি দেশের ভৌগোলিক পরিবেশ, জলবায়ু এবং মানুষের মনস্তত্ত্ব (psychology) সমাজের পরিবর্তনে অনেক বেশি প্রভাব ফেলে।
৪. ফার্নান্দ ব্রদেল এবং ‘দীর্ঘমেয়াদী ইতিহাস’ (Fernand Braudel & The ‘Longue Durée’)
পরবর্তীকালে অ্যানালস স্কুলের সবচেয়ে প্রভাবশালী ঐতিহাসিক হিসেবে আবির্ভূত হন ফার্নান্দ ব্রদেল (Fernand Braudel)।
“Longue Durée” বা দীর্ঘমেয়াদী ইতিহাস কী?
দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের জন্য সহজ ভাষায়, Longue Durée হলো দীর্ঘ সময় ধরে চলা ইতিহাসের ধারা। ব্রদেল মনে করতেন:
-
কোনো রাজনৈতিক যুদ্ধ বা দু-এক বছরের ঘটনা ইতিহাসের সাময়িক ঢেউ মাত্র।
-
কিন্তু কোনো এলাকার ভৌগোলিক পরিবেশ, জলবায়ু এবং সমাজ কাঠামো শত শত বছর ধরে ধীরগতিতে বদলায়।
-
ইতিহাসের এই দীর্ঘমেয়াদী, ধীর ও গভীর পরিবর্তনকে পর্যবেক্ষণ করার পদ্ধতিকেই ‘Longue Durée’ বা দীর্ঘমেয়াদী ইতিহাস বলা হয়।
৫. আধুনিক ইতিহাস চর্চায় প্রভাব (Impact on Modern History)
আধুনিক ইতিহাস চর্চায় অ্যানালস স্কুলের প্রভাব অপরিসীম:
-
নতুন সামাজিক ইতিহাসের পথপ্রদর্শক: এই গোষ্ঠী ইতিহাস চর্চাকে অনেক বেশি মানব-কেন্দ্রিক (human-centric) করে তুলেছে। এর ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীতে ১৯৬০-এর দশকে ‘নতুন সামাজিক ইতিহাস’ (New Social History) শক্তিশালী রূপ লাভ করে।
-
ইতিহাসের প্রসার: ঐতিহাসিক গবেষণায় শুধুমাত্র নথিপত্র বা আর্কাইভের ওপর নির্ভর না করে, সরাসরি সমাজ থেকে তথ্য সংগ্রহের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি তাঁরাই চালু করেন।